রাজিব রায়হান, জাবি প্রতিনিধি: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির পদধারীদের একটি বড় অংশের ছাত্রত্ব শেষ হয়েছে।
এমনকি মাস্টার্সে অকৃতকার্য হওয়ার অছাত্রদের সেই তালিকায় স্থান পেয়েছেন কমিটির সভাপতি –সাধারণ সম্পাদক। এর পরও বিশেষ ছাত্রত্ব দেখিয়ে রাজনতি করেছেন তারা।গত সিন্ডিকেট সভায় অছাত্রদের ৫ কর্মদিবসের মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল কক্ষে স্বামীকে আটকে স্ত্রীকে ধর্ষণের প্রতিবাদে ও ধর্ষকের বিচারের দাবিতে এবং নিপীড়নমুক্ত ক্যাম্পাস গড়ে তোলার দাবিতে ‘নিপীড়ন বিরোধী মঞ্চ’ মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এতে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ এর অধিক শিক্ষকসহ শতাধিক শিক্ষার্থী।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বেলা ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার সংলগ্ন রাস্তায় এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে চার দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। সেগুলো হল- ধর্ষণে অভিযুক্ত অপরাধীদের সর্বোচ্চ বিচার নিশ্চিত করা, অছাত্রদের হল থেকে বের করে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আসন নিশ্চিত করা, যৌন নিপীড়নে অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহমুদুর রহমান জনির শাস্তি, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ সম ফিরোজ-উল হাসান এবং মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক সাব্বির আলমের পদত্যাগের দাবি।
স্বাভাবিকভাবে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আট বছর সময় দেওয়া হয়। এ মধ্যে সম্পন্ন করতে না পারলে ঐ শিক্ষার্থী অছাত্র হিসেবে গণ্য হয়।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছায়া প্রশাসন হয়ে কাজ করছে অছাত্র ছাত্রলীগ নেতাকর্মী। সবগুলো হলে পলিটেকনিক ব্লক তৈরি করেছে এ অছাত্র নেতাকর্মীরা।
তাদের দ্বারায় পরিচালিত হচ্ছে হলের নিয়ম কানুন, রুম বন্টনসহ নানা কর্মকাণ্ড। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা নোটিশ দেওয়া হলেও কোনোভাবেই বের করতে পারছে না অছাত্রদের।
সংগঠনের গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে কমিটিতে রাখা হয়েছে ৪০০ জনের উপরে নেতাকর্মীকে। এদের মধ্যে বর্তমানে ২৭০ জনের উপরে ছাত্রত্ব নেই।
ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও কেন হল ছাড়ছে না এমন প্রশ্নে- মীর মশাররফ হোসেন হলে অবস্থানরত ৪৫তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী জানান, ৪২ ও ৪৩ তম ব্যাচ এখনো হলে অবস্থান করছে, আমরা হলে থাকলে কি সমস্যা! হলে থেকে যারা নিজেদের সাম্রাজ্য দাঁড় করিয়েছে তাদেরকে আগে বের করো তারপর আমাদের আর বের করতে হবে না। আমি নিজেই চলে যাবো। প্রশাসনের কথা কি বলবো! তারা তো ঐ নেতাকর্মীদের পরামর্শে হল চালায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্র ফ্রন্টের সংগঠক সোহাগী সামিয়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হল গুলোতে অবস্থানরত প্রায় ২৫০০ অছাত্রের একটি বড় অংশ ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এজন্যই প্রশাসন এ অছাত্রদের বের করতে ব্যর্থ হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যদি অছাত্রদের বের করতে ব্যর্থ হয়, তবে প্রশাসন ও দখলদারী রাজনীতির বিরুদ্ধে আরও জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলবো আমরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, হল গুলোতে অবস্থান করছে ক্ষমতাসীন দলের বিপুল সংখ্যক অছাত্র নেতাকর্মীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন যদি অছাত্রদের হল থেকে বের করতে চাই তবে প্রথমেই এই অছাত্র নেতাকর্মীদের বের করতে হবে। কিন্তু প্রশাসনেরই ছত্রছায়ায় হলে অবস্থান করছে এইসব নেতাকর্মীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কখনো এ দায় এড়াতে পারবেনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আনিছা পারভীন বলেন, বর্তমানের বিভিন্ন হলে প্রায় ২৫০০ এর অধিক শিক্ষার্থী তাদের ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে হলে অবস্থান করছে।
আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবী করেছি তিন দিনের মধ্যে এই অছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের করার জন্য কিন্তু তারা আমাদের কাছ থেকে পাঁচ দিনের সময় নিয়েছে।
ইতিমধ্যে তিন দিন অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোন ধরনের পদক্ষেপই গ্রহণ করে নাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি অছাত্রদের বের করতে না পারে, তাহলে আমরা আরো জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলবো।
এ বিষয়ে প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নিগার সুলতানা বলেন, ইতিমধ্যেই আমরা বিভিন্ন হলে অবস্থানরত অছাত্রদের বের করার কার্যক্রম শুরু করেছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মানুসারে যদি কোনো শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব শেষ হয়, তবে সে কোনোভাবেই হলে আর অবস্থান করতে পারবে না।
সে যদি হলের পলিটিক্যাল ব্লকেও থাকে, তাকেও কোনো ছাড় দেওয়া হবে না এ বিষয়ে। শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি-সেক্রেটারিও যদি নিয়মানুসারে ছাত্রত্ব হারাই তবে তাদেরকে হল থেকে বের হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে।

