Site icon Daily Dhaka Press

বন্দুকের শেষ গুলিটা

রাজশাহী: পৃথিবীটা বড়ই অদ্ভুত। কেউ বাঁচার জন্য খায় আবার কেউ খাওয়ার জন্য বাঁচে। একই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি অথচ কত পার্থক্য।

শহরের বস্তিতে জন্ম রহমতের। নাম রহমত হলেও তার ওপর কোনো রহমত নেই বললেও চলে। বয়স তার পাঁচ বছর। মা নেই। বাবা নতুন করে আরেটা বিয়ে করেছে। মাকে সে দেখেছে কিনা তার মনে পড়ে না। বস্তির শিশু হওয়ায় সারাদিন তাকে রাস্তাতেই থাকতে হয়। কোনো কোনো দিন রাতেও থাকতে হয় রাস্তায়। কারণ বাড়িতে আসলেই চলে নানা অত্যাচার। জীবন চলে ফুল, আইসক্রিম কিংবা বাদাম বিক্রি করে। এর বাইরেও যে জীবন আছে, এটা তার ছোট্ট মস্তিষ্ক কল্পনাও করতে পারে না। সন্তানকে বড় করার দায়িত্ব যে পিতার এটা সে জানেই না।

তার কাছে জীবন মানে চুরি-ছিনতাই কিংবা নেশায় ডুবে থাকা। যা দেখেই সে বড় হচ্ছে। বাদাম বিক্রি করতে করতে একদিন সে একটি স্কুলে এসে পরলো। সেখানে সে দেখলো তার বয়সী বাচ্চারা পড়াশোনা করছে। কেউ কেউ আবার খেলাধুলা করছে। সবাই সুন্দর পোশাক পড়ে আছে। এসব দেখে তারও স্কুলে পড়ার ইচ্ছা হলো। সে সাহস করে চলে গেল তার বাবার কাছে। বাবাকে সে তার স্কুলে পড়ার ইচ্ছাটা জানালো। বিনিময়ে পেল সে একটা থাপ্পড় আর কিছু গালাগালি। আরো পেল কিছু নীতি বাক্য। যেগুলো অনেকটা এই রকম: পড়াশোনা গরীবের কাজ নয়৷ ও সব বড় লোকের কাজ। গরিবের কাজ একটাই তা হলো টাকা রোজগার করা। টাকা নিয়ে আসতে পারলে বাড়িতে আসবি তা না হলে এ বাড়িতে যেন তোকে আর না দেখি। চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়লাম।

আর সিদ্ধান্ত নিলাম এবাড়িতে আর কোনো দিনই আসবো না। একদিন পার্কে বাদাম বিক্রি করছিলাম। এমন সময় আমার পরিচয় হলো এক ভদ্রলোকের সাথে। ভদ্রলোক প্রতিদিন বিকেলে ব্যায়াম করতে পার্কে আসেন। আমার থেকে মাঝেমধ্যে বাদাম কিনেন। একটা সময় তার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায়। আমার প্রতি তার মায়া জন্মে। ফলে সে আমাকে স্কুলে ভর্তি করে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। এই প্রস্তাব ছিল আমার প্রতি সৃষ্টিকর্তার সবচেয়ে বড় রহমত। কোনো দ্বিধাদন্দ না করে খুব সহজেই রাজি হয়ে গেলাম। স্কুল থেকে কিছু বই দিল আর কিছু বই-খাতা ভদ্রলোক কিনে দিলেন। তিনি আমাকে স্কুলে জন্য সুন্দর একটি পোষাক বানিয়ে দিলেন।

আর আমাকে শর্ত দিয়ে দিলেন ভালোভাবে পড়াশোনা করলে তিনি খরচ দেবেন না হলে তিনি খরচ দেবেন না। শুরু হয়ে গেল নতুন যুদ্ধ। সারাদিন স্কুলে থাকতাম আর বিকেলে বাদাম বিক্রি করতাম। ভালোই চলছিলো সবকিছু। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আমার পথের কাটা হয়ে দাঁড়ালেন আমার বাবা। তিনি আমাকে কিছুতেই পড়াশোনা করতে দেবেন না৷ তিনি চান শুধু টাকা। ভদ্রলোকের সহায়তায় আর নিজের ইচ্ছাশক্তির জোড়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেলাম। স্কুলে অনেক বন্ধু টোকাই বলে গালি দিত। অনেক শিক্ষকও আমাকে আলাদা করে দেখতেন। এসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাতাম না। কারণ টোকাইকে টোকাই বলবে নাতো কি বলবে। মাথা আমার খুব বেশি খারপ না।

কারণ বাদাম বিক্রি করে পড়াশোনার জন্য খুব কমই সময় পাই।তারপরও রেজাল্ট খুব বেশি খারাপ হয় না। আবার একেবারে ভালোও করতে পারিনা। আমার এই রেজাল্টই ভদ্রলোক খুশি।তিনি আমাকে আরো ভালো করে পড়াশোনা করার পরামর্শ দেন। আমার জীবন যে এত সুন্দর ভাবে কাটবে এটা আমি কখনো কল্পনাও করতে পারিনি। প্রাইমারি শেষ করে এখন হাইস্কুলও শেষের দিকে। কিছুদিন পরে আমার ফাইনাল পরিক্ষা। এমন সময় ঘটলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দূর্ঘটনা। ভদ্রলোক মারা গেলেন। মাথায় আমার আকাশ ভেঙে পড়লো। কিছু বুঝতে পারছিলাম না কিভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাব। শিক্ষকদের সহায়তায় স্কুল জীবনটা কোনো মতো পার করলাম। কলেজে ভর্তি হওয়ার টাকা জোগাড় করতে পারছিলাম না।

অনেকের কাছে সাহায্য চেয়েছি কিন্তু কেউ সাহায্যে করেনি৷ তবে কি আমার পড়াশোনা এখানেই থেমে যাবে। আমিও থেমে থাকর মানুষ না। টাকা জোগাড় করতে বস্তির অসৎ ব্যবসায়ীদের খোঁজ করতে থাকলাম এবং তাদের থেকে টাকা ধার চাইলাম। তারা আমাকে টাকা ধার দিলেন না। কিন্তু একটা কাজের কথা বললেন। কাজটা ছিলো নেশাদ্রব্য পাচারের কাজ। প্রথমে অসৎ কাজ ভেবে রাজি হলাম না। কিন্তু টাকার প্রয়োজনের কথা ভেবে রাজি হয়ে গেলাম। সেটা যে আমার বাবার পাতানো ফাঁদ ছিলো আমি জানতাম না। আমার বাবা কখনোই চাইতো না আমি পড়াশোনা করি। নেশাদ্রব্য পাচারের মাঝপথে পুলিশ আমাকে ধরে ফেলে। কারণ আমার বাবা আগেই পুলিশকে সব বলে দিয়েছিল। এক বছরের জেল হয়ে গেল। জেল থেকে ছাড়ানোর কেউ না থাকায় পুরো এক বছরই জেল খাটতে হলো ৷

জেল থেকে বের হয়ে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারছিলাম না। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম আবার ঘুরে দাঁড়াব। অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে কলেজে ভর্তি হতে গেলাম। অনেক কলেজে ঘুরলাম। কিন্তু কোনো কলেজ আমাকে ভর্তি নিল না। কারণ জেল ফেরত আসামিকে কেউ ভর্তি নেবে না। মানসিকভাবে অনেক ভেঙে পড়লাম। কি করবো বুঝতিছিলাম না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম যে রাস্তার জন্য আমার আজ এই অবস্থা সেই অন্ধকার রাস্তাতেই আবার ফিরে যাব। তবে সেই রাস্তাতে এবার রাজ করবো। আমার এক ডাকাত সর্দারের সাথে পরিচয় হলো। যোগ দিলাম ডাকাত দলে। নাম হয়ে গেল “রহমত ডাকাত”। অল্প দিনেই সর্দারের খুব প্রিয় হয়ে উঠলাম।

সামান্য পড়াশোনা জানায় ডাকাতিতে অনেক সুবিধা হতো। একবার একজায়গায় ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের সাথে যুদ্ধ লেগে যায়। পুলিশের গুলিতে সর্দার মারা যায়। আমরা কোনো রকমে পালিয়ে যাই। পরবর্তী সর্দার হই আমি। ডাকাতি শেষে যখন ঘুমাতে যেতাম নিজের মধ্যে একটা অপরাধ বোধ কাজ করতো। হতে চেয়েছিলাম কি আর হয়ে গেলাম কি। পৃথিবী বড়ই অদ্ভুত। নিজের প্রতি এই অপরাধ বোধটা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে একসময় আর ঘুমাতে পারতাম না। আসলে সব মানুষ সব কাজ করতে পারে না। একসময় মনে করতাম অর্থ-সম্পদ পেলে হয়তো আর দুঃখ-কষ্ট থাকবে না। কিন্তু এখন অর্থ-সম্পদ পেয়েও আমি সুখী না। ডাকাতি ছেড়ে দিয়ে যে অন্য কাজ শুরু করবো তাও পারবো না। কারণ কাগজের ওপর কালো দাগ পড়লে সেটা মুছে ফেলা যায় অথবা ছিড়ে ফেলা যায়। কিন্তু মানুষের ওপর একবার কালো দাগ পড়লে সে দাগ আর মোছা যায় না। অন্ধকার রাস্তাতে একবার ঢুকে পড়লে সে রাস্তা থেকে আর বের হওয়া যায় না। আজ এক ধনী লোকের বাড়িতে ডাকাতি করতে এসেছি। ডাকাতি প্রায় শেষ এমন সময় শুনতে পেলাম পুলিশ বাড়িটি ঘিরে ফেলেছে।

কিছুক্ষণ পর শুনতে পেলাম পুলিশ মাইকে ডাকাডাকি শুরু করেছে। আমি আমার ডাকাত সদস্যদের হুকুম দিলাম বন্দুক চালানোর। চাইলে আমি পালিয়ে যেতে পারবো। কিন্তু তা না করে আমি আমার সদস্যদের পালাতে বললাম। তারা একে একে সবাই পালিয়ে গেল। আমি একাই লড়াই করে গেলাম। একটা সময় দেখলাম আমার বন্দুকে আর একটা মাত্র গুলি বাকি আছে। শুণ্য আকাশের দিকে তাকিয়ে কয়েকটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে নিজের অতীতের কথা চিন্তা করলাম। তারপর বন্দুকের শেষ গুলিটা নিজের মাথায় চালিয়ে দিলাম।

মোঃ আসিফ
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Exit mobile version