সিরাজগঞ্জ: রিয়াদ ও শুভ দুই বন্ধু। ছোটবেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দুজনের পরিচয়, এছাড়াও তারা দুজন একই এলাকার দু পাশে থাকে। ছোটবেলা থেকে দুজন অনেক ভালো বন্ধু। প্রাথমিকে পড়া শেষ করার পর রিয়াদ একটা সুনামধন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সুনামধন্য কলেজে পড়া শেষ করে, বর্তমানে একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। অন্যদিকে শুভ প্রাথমিকের পর মাধ্যমিকে কোনোরকম পড়াশোনা করেই সংসারের তাড়নায় কাজে যোগ দেয়। সেখানে কাজ করার কারণে তার আর পড়াশোনায় ফিরা হয় নি শেষ পর্যন্ত। রিয়াদ আর শুভ ভালো বন্ধু হলেও তাদের মাঝে বন্ধুত্বের মধুর সম্পর্কটা আস্তে আস্তে মাধ্যমিকের পর থেকে কমতে থাকে। প্রাথমিকের পর থেকে তেমন একসাথে না থাকাতে দূরত্ব একটু বাড়ে কিন্তু একই এলাকায় হওয়াতে দেখা হতো তাদের। রিয়াদ শহরে পড়াশোনা করে সেখানে তার নতুন নতুন বন্ধু হওয়াতে সে আর শুভ এর সাথে আগের মতো মিলামেশা করত না, যোগাযোগ ও তেমন নাই বললেই চলপ। খোঁজখবর শুভ রিয়াদের নিলেও রিয়াদ তার ব্যস্ততার কথা বলে পাশ কাটিয়ে নিতো খোঁজখবরের কথা উঠিলেই। তারপরও শুভ ঠিক ই রিয়াদকে তার ভালো বন্ধু ই মনে করে।
এমনিতে রিয়াদ আর শুভ দু’জনের বাড়ি একই গ্রামেই। মাঝে মধ্যে তাদের দেখা হয় রাস্তা ঘাটে, তখন টুকটাক কথা বার্তা হয়ে থাকে। শুভ যেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেল, শুভ খুশিতে সবাইকে মিষ্টি খাওইয়ে ছিলো। শুভ সকলের কাছে রিয়াদের নামে প্রশংসা করে বেড়াই তার বন্ধু যে অনেক বড় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। কিন্তু রিয়াদ কি শুভকে আগের মতো বন্ধু ভাবে যতটা শুভ ভাবে! না একদম ই না। রিয়াদ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর আরো ভুলতে বসে শুভকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি র পর সবাই সবার বন্ধু বান্ধব নিয়ে গল্প বললেও শুভের ক্যারিয়ার দেখে রিয়াদ শুভের কথা কাউকে বলে না। বন্ধু বান্ধব দের কাছে কখনই শুভকে নিয়ে কখনোই কিছু বলে না, শুধু মাত্র শুভ পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে বলে।

এদিকে শুভ একদিন ঢাকায় একটা কাজে আসে,তার ঢাকাতে পরিচিত বলতে রিয়াদ ছাড়া কেউ নেই। শুভ সরাসরি চলে গেলো রিয়াদের বিশ্ববিদ্যালয়ে, সেখানে গিয়ে সে অনেক খোজাখুজির পর রিয়াদকে অবশেষে পেল, রিয়াদ তখন তার বন্ধু বান্ধব দের সঙ্গে বসে গল্প করছিলো, এমন সময় শুভে এসে রিয়াদকে পেয়েই বন্ধু বলে জড়িয়ে ধরতে নিলে রিয়াদ শুভকে এক কথাতেই বললো আপনি কে! শুভ তো হতভম্ব হয়ে গেলো তখন রিয়াদকে বলছে, কিরে দোস্ত তুই কি মজা করতাছোস আমার লগে,আমি শুভ । রিয়াদের বন্ধুরা বলছে, কে রে রিয়াদ। রিয়াদ তুই তো কখনোই এর কথা আমাদের বলিস নি। রিয়াদ ভাবতে লাগলো, শুভকে তাদের সামনে পরিচয় করানো যাবে না, না হলে তার মান সম্মান থাকবে না। রিয়াদ তার বন্ধুদের বললো আরে চিনি না রে, কোথা থেকে আসছে মনে হয়, কাকে খুঁজতে এসে আমাকে বলছে। রিয়াদের বন্ধু রা শুভকে বললো আরে৷ ভাই তুমি যারে খুজতাছে সে নয় এটা, যাও তো ভাই। তারপরও শুভ কিছু বলার চেষ্টা করলে, রিয়াদ শুভকে সরাসরি না চেনার কথা বলে তার বন্ধু বান্ধব নিয়ে চলে গেলো। শুভ চুপচাপ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো, তার বন্ধু তাকেই চিনছে না! এরপরও শুভ ভাবলো ও হইতো মজা করছে, কিন্তু না সত্যিই রিয়াদ এমনটাই করলো।
শুভ গ্রামে ফিরে গেলো। গ্রামে সেখানে তার মা তাকে জিজ্ঞেস করল কীরে রিয়াদের সাথে দেখা হয়েছিলো তোর? ওর কাছেই ছিলি মনে হয়,শহর ঘুরে দেখাইছে না? শুভ হাসিমুখে বললো হ্যাঁ মা রিয়াদের ওখানে কত মজা হলো, ওর বিশ্ববিদ্যালয় টাও কতবড়,ওর কত বন্ধু বান্ধব ওখানে আমাকে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। মা বললো তাহলে ২/১ দিন থাকলি না, শুভ উত্তর দিলো, গ্রামের কথা মনে হচ্ছিল অনেক তাই চলে আসলাম,আবার যাবো তো বলেই শুভ বললো নাও এবার ভাত দাও তো। এরপর অনেকদিন কেটে গেলো। তারপরও শুভ রিয়াদকে তার ভালো বন্ধুই মনে করে সবসময়। একদিন গ্রামে ছুটি কাটাতে রিয়াদ বাড়ি আসলো। বাড়ি ফিরেই দেখে তার দুলাভাই নতুন বাইক কিনেছে, রিয়াদ দুলাভাইয়ের কাছে আবদার করলো তাকে বাইকটা চালাতে দিতে হবে। রিয়াদের দুলাভাইও না করতে পারলো না তার একটাই শ্যালক।
এরপর রিয়াদ তার দুলাভাইয়ের বাইক নিয়ে বের হলো ঘুরার জন্য, নতুন বাইক নিয়ে সে শহরে গিয়ে । ওখান থেকে কিছু ক্ষণ ঘুরে সে বাড়ি ফিরছিলো, দ্রুত গতিতে বাইকে চালানোর কারণে হঠাৎ আচমকা পিক আপ গাড়ি চলে আসায় রাস্তায় তার দুর্ঘটনা ঘটে যায়। পিক-আপের চালক সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি নিয়ে পালায়। রিয়াদের অবস্থা খারাপ, রিয়াদকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। প্রচুর রক্ত ঝড়ছিলো। শুভ এতোক্ষণে খবর পেয়ে গেছে তার বন্ধুর অবস্থার কথা, সে দ্রুত হাসপাতালে চলে আসে। ডাক্তার রিয়াদের বাবা-মা কে বলছে দ্রুত রক্তের প্রয়োজন নইলে রিয়াদকে বাঁচানো যাবে না। রিয়াদের অন্যান্য বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছিলো, কিন্তু কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসছিলো না। এদিকে তারা অনেক খোজাখুজি করেও রিয়াদের যে গ্রুপ সেটা পাচ্ছিলো না। শুভ রিয়াদের পরিবারের থেকে সকল ঘটনা শুনে সে বললো আমার বন্ধুকে আমি রক্ত দিব, রিয়াদের সাথে তার গ্রুপ মিলে। রক্ত দেওয়ার পরও রিয়াদের জ্ঞান না ফিরা অবধি শুভ হাসপাতালে ই থাকে আর তার বন্ধুর জন্য দোয়া করতে থাকে।
সঠিক সময়ে রক্তদানের কারণে রিয়াদ এবারের মতো আল্লাহর রহমতে রক্ষা পায়। রিয়াদ আস্তে আস্তে সুস্থ হয়। সুস্থ হওয়ার পর জানতে পারে তার বন্ধুর জন্য তার আজ রক্ষা। সব শুনেই দুর্ব্যবহারের জন্য সে অনেক অনুতপ্ত বোধ করছিলো। রিয়াদ হাসপাতাল থেকে ফিরেই ছুটে যায় তার বন্ধুর কাছে, গিয়ে বন্ধুর কাছে মাফ চায়। শুভ তো রিয়াদকে সবসময় বন্ধুই মনে করেই আসছে তাই সে রিয়াদকে হেসে বলে ধুর তুই যেমন ই করোস তুই তো আমার ই বন্ধু ছিলি আর থাকবিও। তোর উপরে কি আর আমি রাগ করে থাকতে পারি। এরপর থেকে সব সময় রিয়াদ শুভকে সকল জায়গায় তার বন্ধু হিসেবে বুক ফুলিয়ে পরিচয় দেয়।
এই গল্পে রিয়াদ ও শুভের মতো আমাদের সমাজে অনেক এমন ঘটনা ঘটেই চলছে। আমরা একটু শিক্ষিত হলেই,আমাদের একটু কম শিক্ষিত বন্ধু / মানুষকে অবহেলা, অপমান করি। কিন্তু তারা অশিক্ষিত হলেও তারা মনে দিক থেকেই অনেক ভালো হয়ে থাকে, আমাদের বিপদে তারা কোনো চিন্তা না করেই এগিয়ে আসে ৷ তাই আমাদের উচিত সকলকে সম্মান করা। সকলের সাথে ভালোভাবে মিলেমিশে থাকা।
মোঃ রিফাত রহমান রাব্বি
হিসাববিজ্ঞান বিভাগ
সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ