
সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ করেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর শাহবাগ, সায়েন্সল্যাবসহ বেশি পয়েন্টে অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছেন তারা। এছাড়া সারা দেশে সড়ক-মহাসড়ককে একই কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। সকাল-সন্ধ্যা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচির কারণে আজ স্থবির হয়ে পড়ে রাজধানী ঢাকা। মোড়ে মোড়ে শিক্ষার্থীরা অবরোধ করায় ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। ছিল না পর্যাপ্ত বাস। কিছু সড়কে ছিল তীব্র যানজট। এতে অ্যাম্বুলেন্স ও জরুরি সেবার যানবাহন ছাড়া সব ধরনের গণপরিবহণ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সরেজমিন দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা ছোট ছোট মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জড়ো হন। পরে সেখান থেকে মিছিল ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ স্থান প্রদক্ষিণ করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টিএসসির মোড়ে বসে পড়েন শিক্ষার্থীরা। বিকেল ৫টার দিকে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এসময় পুলিশের সাঁজোয়া যানে উঠে পড়েন ছাত্ররা। সাঁজোয়া যান ঘিরেই বিক্ষোভ করেন তারা।

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ড. খ. মহিদ উদ্দিন বলেছেন, পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে শাহবাগে অবস্থান নিয়েছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এ সময় কিছু শিক্ষার্থীকে পুলিশের সাঁজোয়া যানের ওপর উঠে উল্লাস করতেও দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের এমন আচরণের পরও পুলিশ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, কোটা নিয়ে আদালতের নির্দেশনার পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের অবকাশ ছিল না। তাই তাদের রাস্তায় না নামতে অনুরোধ করেছিলাম। কিন্তু তারা নেমে পড়লেন। তারপরেও পুলিশ ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। আশা করি আজকেই এটা (আন্দোলন) শেষ হবে। পুলিশ চায় না শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কিছু হোক। তাদেরও বোঝা উচিত। তাদেরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।
আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, একদফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা ঘরে ফিরবেন না। কোটা থাকলেও সর্বোচ্চ পাঁচ শতাংশ থাকতে পারে, এর বেশি নয়। এ বিষয়ে আদালত নয়, তারা নির্বাহী বিভাগ ও সংসদ থেকে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করতে যাওয়ার পথে পুলিশের বাধার মুখে পড়েছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পরে বাধা ঠেলে তাঁরা মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকা অবরোধ করেন। মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। আধা ঘণ্টা ধরে চলা পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়েন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে পুলিশ। এতে পুলিশ, সাংবাদিকসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। শিক্ষার্থীদের অবরোধের মুখে পিছু হটে পুলিশ। এ সময় মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অন্তুবলেন, পুলিশের লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাসের শেলের আঘাতে সাংবাদিক, শিক্ষার্থীসহ বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। মিনহাজ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা কোটবাড়ীর দিকে রওনা দেওয়ার পরপরই পুলিশ আমাদের বাধা দেয়। তারপর শিক্ষার্থীরা একত্র হয়ে কোটবাড়ী বিশ্বরোডে এসে অবরোধ শুরু করেন।

এদিকে সর্বোচ্চ আদালতে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে চূড়ান্ত শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হবে কোটার বিষয়টি। এ পর্যন্ত মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি হতে পারে এমন কর্মসূচি বন্ধ করে আদালতের নির্দেশ মেনে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরাতে উপাচার্যদের নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। আজ বৃহস্পতিবার ইউজিসি সচিব ড. ফেরদৌস জামান স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের প্রদত্ত পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা প্রতিপালন প্রসঙ্গে’।
চিঠিতে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দায়ের করা দুটি সিভিল পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালতের দেওয়া এসব পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা প্রতিপালনের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ জানানো হলো। নির্দেশনাগুলো হলো সব প্রতিবাদকারী কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীদের স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে নিজ নিজ কাজে অর্থাৎ পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে বলা হলো; দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য/প্রক্টরকে ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের তাঁদের ছাত্র-ছাত্রীদের স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে নিয়ে শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করবেন মর্মে আদালত আশা করে এবং স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদকারী ছাত্র-ছাত্রীরা চাইলে আইনজীবীর মাধ্যমে তাঁদের বক্তব্য আদালতের সামনে তুলে ধরতে পারবেন। আদালত মূল দরখাস্তটি নিষ্পত্তিকালে তাঁদের বক্তব্য বিবেচনায় নেবেন।

রাজধানীর শাহবাগ সড়ক অবরোধ: কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে চতুর্থ দিনের মতো রাজধানীসহ সারাদেশে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা। আজ বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় অবরোধে নামেন। অবরোধের বিভিন্ন সড়কে আটকা পড়ে শত শত যানবাহন। এতে ভোগান্তিতে পড়েন হাজার হাজার মানুষ। বিশেষ করে চাকরিজীবী ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বেশি বিপদে পড়েন। রাস্তায় যানবাহন চলাচল করতে না পারায় শিশু, নারী, বৃদ্ধসহ সবাই হেঁটেই গন্তব্যে যান। আন্দোলনকারীরা সকালে রাজধানীর শাহবাগ ও সায়েন্স ল্যাব মোড় আটকে দেন। পরে একে একে কাঁটাবন, নীলক্ষেত, ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামটর, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, বিজয়সরণি, মহাখালী, চানখাঁরপুল, বঙ্গবাজার, শিক্ষা চত্বর, মৎস্য ভবন, জিপিও, গুলিস্তান, রামপুরা ব্রিজ, আগারগাঁও, হাতিরঝিল মোড়, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারসহ যানজটের সৃষ্টি হয়।
ঢাকার বাইরে মোড়ে মোড়ে অবরোধ ও বিক্ষোভ: এদিকে কোটা পদ্ধতির সংস্কার দাবিতে আজ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এতে প্রায় অচল হয়ে পড়ে চট্টগ্রাম নগরী। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও পথচারীর কয়েক দফা বাদানুবাদ এবং হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যেই রেলপথ অবরোধ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) শিক্ষার্থীরা। আজ সন্ধ্যা ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজার সংলগ্ন রাজশাহী-ঢাকা রেলপথ অবরোধ করেন তারা। এ ছাড়া সড়ক অবরোধ করে কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়ক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
প্রকাশক : মোহাম্মদ বদরুজ্জামান তালুকদার
সম্পাদক : খান মোহাম্মদ সালেক
Copyright © 2026 Daily Dhaka Press. All rights reserved.