Site icon Daily Dhaka Press

ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের ৮ দাবি

প্রসেনজিৎ চৌধুরী: জামিনে মুক্তদের জেল গেইটে পুনঃগ্রেফতার বন্ধ, আনন্দ প্রকাশ চাকমাসহ ইউপিডিএফ ও দেশের রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর সংগঠক মাইকেল চাকমা আজ ২৭ আগস্ট ২০২৪ ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে বলেন

প্রথমে আবু সাঈদ ও মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ সহ জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। যারা আহত হয়েছেন তাদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। তাদের মহান আত্মত্যাগের ফলে বাংলাদেশ আজ দ্বিতীয় স্বাধীনতা লাভ করেছে। আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ তাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ আমি মুক্ত, যেন মৃত্যু থেকে আমার ফিরে আসা। গোপন বন্দীশালা তথাকথিত আয়নাঘর থেকে যাদেরকে এখনও মুক্তি দেয়া হয়নি, আমি তাদের মুক্তির জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বর্তমানে দেশে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে। ভবিষ্যতে এদেশে যাতে আর কোনো ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম হতে না পারে, সেই লক্ষ্যে নতুন সরকার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ইউপিডিএফ এই সরকারের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করেছে। তার লিখিত বক্তব্যে আরও বলেন

পতিত ফ্যাসিস্ট জালিম সরকারের দুঃশাসনে দেশের জনগণের নাভিঃশ্বাস উঠেছিল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করা হয়েছিল। সরকারের অন্যায় অবিচারের সামান্য সমালোচনা করলেও নাগরিকরদেরকে জেলে ঢোকানো হয়েছে, মিথ্যা মামলায় জর্জরিত করা হয়েছে। ক্রসফায়ারের নামে হত্যা, গুম ছিল তখন স্বাভাবিক ঘটনা। আয়নাঘর নামক বেআইনী গোপন বন্দীশালা খুলে সেখানে লোকজনকে বছরের পর বছর আটক রাখা হয়েছে। নাৎসীদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মতো সেই বন্দীশালায় অত্যাচারের ভয়াবহ কাহিনী এখন প্রকাশিত হচ্ছে। এক কথায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশকে এক নরক রাজ্যে পরিণত করেছিল।

শুধু সমতলে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামেও হাসিনার সরকার দমনপীড়নের স্টীম রোলার চালায়, যার শিকার হয় প্রধানত ইউপিডিএফ। তার ১৫ বছরের শাসনামলে ইউপিডিএফকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক কার্যক্রম চালাতে দেয়া হয়নি। পার্টির সকল অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়। অর্ধ শতাধিক নেতাকর্মীকে বিনা বিচারে হত্যা, গুম ও আরো অনেককে গ্রেফতার-নির্যাতন করা হয়েছে। আদালত থেকে জামিন পেলেও জেলগেট থেকে একই বন্দীকে বার বার আটক করে জেলে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর খাগড়াছড়িতে একটি ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী গঠন করে দেয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এই বাহিনী হাসিনা সরকারের ছত্রছায়ায় ১৮ আগস্ট ২০১৮ স্বনির্ভর গণহত্যা ও ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ সালের পানছড়িতে চার যুবনেতা হত্যাসহ অসংখ্য হত্যা, অপহরণ ও গুমের সাথে জড়িত। মোট কথা, পার্বত্য চট্টগ্রামে হাসিনা আমলের অন্যায় অত্যাচার ও জুলুমের কাহিনী এখানো বলে শেষ করা যাবে না।

জুলুমবাজ ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের লক্ষ্যে সমতলের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তির পাশাপাশি ইউপিডিএফ-ও আন্দোলনে সামিল হয়েছে। আমরা গত ৭ জানুয়ারীর তার ভূয়া নির্বাচনের তফশিল প্রত্যাখ্যান এবং নির্বাচন বর্জন করেছি। আমাদের পার্টির আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনগণ ভোট কেন্দ্রে যায়নি, ২৭টি ভোট কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। তার রক্তচক্ষু, জবরদস্তি ও দমনপীড়ন আমাদের পার্টি ও জনগণকে দমাতে পারেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে তার দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী, এমপিদের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে।
অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে। দেশের মানুষ এখন মুক্ত হাওয়ায় প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ এখনও স্বাধীনতার সেই স্বাদ পায়নি। পাহাড়ে এখনও পরিবর্তনের হাওয়া পৌঁছেনি। সমতলে অন্যায়ভাবে আটক রাজবন্দীরা মুক্তি পেতে শুরু করলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্দী ইউপিডিএফ ও তার সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদের এখনও ছেড়ে দেয়া হয়নি। এই বন্দীদের অনেকে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন। হাসিনার আমলে জামিন পাওয়ার পরও জেল গেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার করার কারণে তারা এখন নতুন করে আদালতে জামিনের আবেদন করতে সাহস পাচ্ছেন না। সমতলে ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর ও সহযোগিদের কেউ কেউ গ্রেফতার হলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামে তারা এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে এবং সমতলেগ মুক্ত হাওয়া পাহাড়ে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এখানে দু’একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

১০ আগস্ট খাগড়াছড়িতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আঁকা অপহৃত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমার গ্রাফিতি মুছে দেয়।

১২ আগস্ট খাগড়াছড়িতে গ্রাফিতি আঁকার সময় সেনারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় এবং প্রনয় চাকমা নামে এক শিক্ষার্থীকে জোনে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালায়।

১৭ আগস্ট একইভাবে বান্দরবানের রুমায় গ্রাফিতি অংকনে শিক্ষার্থীদের প্রথমে বাধা এবং পরে ক্যাম্প কমান্ডারের লিখিত অনুমতি নিতে বাধ্য করা হয়।

পতিত হাসিনা সরকারের আমলে সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে নব্য মুখোশ বাহিনী এখনও আগের মতোই রয়েছে। গত ১৮ আগস্ট তারা খাগড়াছড়ির চেঙ্গীস্কয়ার এলাকায় একটি প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমাকে গুরুতর আহত করে। তিনি চোখে গুরুতর আঘাত পান এবং চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে যেতে বাধ্য হন। এখনও তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি।

২৩ আগস্ট খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে তিন পাহাড়ি নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন। খাগড়াছড়ির রামগড়ে কয়েকজন সেটলার এক চাকমা গৃহবধূকে গণধর্ষণ করে। একইদিন বান্দরবানের নাক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী জনৈক তঞ্চঙ্গ্যা নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় এবং রাঙামাটি শহরের বনরূপা বাজারে ৭ বছরের এক পাহাড়ি মেয়ে শিশু ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়। এছাড়া নাসিমা আক্তার (৩০) নামে খাগড়াছড়ির রামগড়ে দক্ষিণ বালুখালীর কালাপানি এলাকার এক নারীও ধর্ষিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২৫ আগস্ট রামগড় উপজেলার ২ নং পাতাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নং ওয়ার্ডের সদস্য ভারত কুমার চাকমাকে মানিকছড়ির বাটনাতলি ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।

২৫ আগস্ট মধ্য রাতে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর সদস্যরা খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি উপজেলাধীন বান্যাছোলা গ্রাম থেকে অন্তর চাকমা নামে ৪৫ বছর

বয়সী এক ব্যক্তিকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে।

আমাদের প্রশ্ন হলো, সমতলে গ্রাফিতি আঁকতে বাধা দেয়া না হলে, একই দেশের অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন বাধা দেয়া হবে?

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক দশমাংশ। তাই স্বাভাবিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে দেশে প্রকৃত ও অর্থবহ সংস্কার হতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন বা নিপীড়নমূলক অবস্থা জারি রেখে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে গণতন্ত্র কায়েম হওয়া অসম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে মুক্তি না দিয়ে সমতলের জনগণও প্রকৃত মুক্তি পেতে পারে না। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে হাসিনার সরকার পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস তারই প্রমাণ দেয়। কাজেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে কোন সংস্কার পরিকল্পনায় কিংবা গণতন্ত্রায়নের প্রক্রিয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামেও আমূল সংস্কার আনতে হবে। তা নাহলে দেশে আবার আগের মতো ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম হতে পারে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দাবি:

এ কারণে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে সংস্কার কার্যক্রমের প্রাথমিক ও আশু পদক্ষেপ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে নিম্নোক্ত দাবি জানাচ্ছি:

১) অবিলম্বে জুলাই-আগস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের সময় নিহত সকল শহীদের নাম প্রকাশ ও হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ফ্যাসিস্টদের গ্রেফতার পূর্বক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

২) অবিলম্বে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলে আটক ইউপিডিএফ ও তার সহযোগি সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মুক্তি দিতে হবে; আদালত থেকে জামিন লাভের পর জেল গেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার বন্ধ করতে হবে; এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে ইউপিডিএফ ও তার সহযোগি সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের নামে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা ও হুলিয়া প্রত্যাহার করতে হবে। ৩) ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে নব্য মুখোশ বাহিনী ও মগ পার্টি ভেঙে দিতে হবে এবং তাদের মধ্যে যারা খুন, গুম, অপহরণ ও সন্ত্রাসের সাথে জড়িত তাদের গ্রেফতার পূর্বক শাস্তি দিতে হবে।

৪) স্বনির্ভর গণহত্যা ও পানছড়িতে চার যুব নেতা হত্যাসহ ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত সকল হত্যাকান্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করতে হবে এবং তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে যুক্ত করতে হবে।

৫) অবিলম্বে নির্দলীয়, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ পুনর্গঠন করতে হবে।

৬) অবিলম্বে বান্দরবানে চলমান কেএনএফ-বিরোধী অভিযানের নামে বম জাতিগোষ্ঠীকে নিশানা করে জাতি-নিধন অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং শিশু ও নারীসহ আটককৃত বমদের মুক্তি দিতে হবে।

৭) খাগড়াছড়ির রামগড়ে গৃহবধূকে ধর্ষণকারীদের গ্রেফতার এবং রাঙামাটি ও বান্দরবানে ধর্ষণ প্রচেষ্টার সাথে জড়িতদের শাস্তি দিতে হবে।

৮) পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অপারেশন উত্তরণ বাতিল পূর্বক সেনাশাসন প্রত্যাহার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ১১ দফা নির্দেশনা বাতিল করতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।পার্টি ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) এর সংগঠক মাইকেল চাকমা আজ ২৭ আগস্ট ২০২৪ ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে বলেন প্রথমে আবু সাঈদ ও মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ সহ জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের শহীদদের গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। যারা আহত হয়েছেন তাদের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। তাদের মহান আত্মত্যাগের ফলে বাংলাদেশ আজ দ্বিতীয় স্বাধীনতা লাভ করেছে। আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ, কারণ তাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ আমি মুক্ত, যেন মৃত্যু থেকে আমার ফিরে আসা। গোপন বন্দীশালা তথাকথিত আয়নাঘর থেকে যাদেরকে এখনও মুক্তি দেয়া হয়নি, আমি তাদের মুক্তির জন্য জোর দাবি জানাচ্ছি।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বর্তমানে দেশে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে। ভবিষ্যতে এদেশে যাতে আর কোনো ফ্যাসিস্ট শাসন কায়েম হতে না পারে, সেই লক্ষ্যে নতুন সরকার অঙ্গীকার নিয়ে কাজ করছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। ইউপিডিএফ এই সরকারের প্রতি তার সমর্থন ব্যক্ত করেছে। তার লিখিত বক্তব্যে আরও বলেন

পতিত ফ্যাসিস্ট জালিম সরকারের দুঃশাসনে দেশের জনগণের নাভিঃশ্বাস উঠেছিল। মত প্রকাশের স্বাধীনতা রুদ্ধ করা হয়েছিল। সরকারের অন্যায় অবিচারের সামান্য সমালোচনা করলেও নাগরিকরদেরকে জেলে ঢোকানো হয়েছে, মিথ্যা মামলায় জর্জরিত করা হয়েছে। ক্রসফায়ারের নামে হত্যা, গুম ছিল তখন স্বাভাবিক ঘটনা। আয়নাঘর নামক বেআইনী গোপন বন্দীশালা খুলে সেখানে লোকজনকে বছরের পর বছর আটক রাখা হয়েছে। নাৎসীদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের মতো সেই বন্দীশালায় অত্যাচারের ভয়াবহ কাহিনী এখন প্রকাশিত হচ্ছে। এক কথায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনা দেশকে এক নরক রাজ্যে পরিণত করেছিল।

শুধু সমতলে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামেও হাসিনার সরকার দমনপীড়নের স্টীম রোলার চালায়, যার শিকার হয় প্রধানত ইউপিডিএফ। তার ১৫ বছরের শাসনামলে ইউপিডিএফকে স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক কার্যক্রম চালাতে দেয়া হয়নি। পার্টির সকল অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়। অর্ধ শতাধিক নেতাকর্মীকে বিনা বিচারে হত্যা, গুম ও আরো অনেককে গ্রেফতার-নির্যাতন করা হয়েছে। আদালত থেকে জামিন পেলেও জেলগেট থেকে একই বন্দীকে বার বার আটক করে জেলে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর খাগড়াছড়িতে একটি ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী গঠন করে দেয়া হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এই বাহিনী হাসিনা সরকারের ছত্রছায়ায় ১৮ আগস্ট ২০১৮ স্বনির্ভর গণহত্যা ও ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ সালের পানছড়িতে চার যুবনেতা হত্যাসহ অসংখ্য হত্যা, অপহরণ ও গুমের সাথে জড়িত। মোট কথা, পার্বত্য চট্টগ্রামে হাসিনা আমলের অন্যায় অত্যাচার ও জুলুমের কাহিনী এখানো বলে শেষ করা যাবে না।

জুলুমবাজ ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের লক্ষ্যে সমতলের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও ব্যক্তির পাশাপাশি ইউপিডিএফ-ও আন্দোলনে সামিল হয়েছে। আমরা গত ৭ জানুয়ারীর তার ভূয়া নির্বাচনের তফশিল প্রত্যাখ্যান এবং নির্বাচন বর্জন করেছি। আমাদের পার্টির আহ্বানে সাড়া দিয়ে জনগণ ভোট কেন্দ্রে যায়নি, ২৭টি ভোট কেন্দ্রে একটি ভোটও পড়েনি। তার রক্তচক্ষু, জবরদস্তি ও দমনপীড়ন আমাদের পার্টি ও জনগণকে দমাতে পারেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামে তার দুর্নীতিগ্রস্ত মন্ত্রী, এমপিদের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে।
অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীন হয়েছে। দেশের মানুষ এখন মুক্ত হাওয়ায় প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণ এখনও স্বাধীনতার সেই স্বাদ পায়নি। পাহাড়ে এখনও পরিবর্তনের হাওয়া পৌঁছেনি। সমতলে অন্যায়ভাবে আটক রাজবন্দীরা মুক্তি পেতে শুরু করলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্দী ইউপিডিএফ ও তার সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদের এখনও ছেড়ে দেয়া হয়নি। এই বন্দীদের অনেকে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বিনা বিচারে কারাগারে অন্তরীণ রয়েছেন। হাসিনার আমলে জামিন পাওয়ার পরও জেল গেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার করার কারণে তারা এখন নতুন করে আদালতে জামিনের আবেদন করতে সাহস পাচ্ছেন না। সমতলে ফ্যাসিস্ট হাসিনার দোসর ও সহযোগিদের কেউ কেউ গ্রেফতার হলেও, পার্বত্য চট্টগ্রামে তারা এখনও বহাল তবিয়তে রয়েছে এবং সমতলেগ মুক্ত হাওয়া পাহাড়ে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এখানে দু’একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

১০ আগস্ট খাগড়াছড়িতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের আঁকা অপহৃত হিল উইমেন্স ফেডারেশনের নেত্রী কল্পনা চাকমার গ্রাফিতি মুছে দেয়।

১২ আগস্ট খাগড়াছড়িতে গ্রাফিতি আঁকার সময় সেনারা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায় এবং প্রনয় চাকমা নামে এক শিক্ষার্থীকে জোনে নিয়ে গিয়ে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন চালায়।

১৭ আগস্ট একইভাবে বান্দরবানের রুমায় গ্রাফিতি অংকনে শিক্ষার্থীদের প্রথমে বাধা এবং পরে ক্যাম্প কমান্ডারের লিখিত অনুমতি নিতে বাধ্য করা হয়।

পতিত হাসিনা সরকারের আমলে সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে নব্য মুখোশ বাহিনী এখনও আগের মতোই রয়েছে। গত ১৮ আগস্ট তারা খাগড়াছড়ির চেঙ্গীস্কয়ার এলাকায় একটি প্রদীপ প্রজ্জ্বলন অনুষ্ঠানে হামলা চালিয়ে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক রিতা চাকমাকে গুরুতর আহত করে। তিনি চোখে গুরুতর আঘাত পান এবং চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রামে যেতে বাধ্য হন। এখনও তিনি সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি।

২৩ আগস্ট খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে তিন পাহাড়ি নারী যৌন সহিংসতার শিকার হন। খাগড়াছড়ির রামগড়ে কয়েকজন সেটলার এক চাকমা গৃহবধূকে গণধর্ষণ করে। একইদিন বান্দরবানের নাক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের ৯ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা ৪০ বছর বয়সী জনৈক তঞ্চঙ্গ্যা নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় এবং রাঙামাটি শহরের বনরূপা বাজারে ৭ বছরের এক পাহাড়ি মেয়ে শিশু ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়। এছাড়া নাসিমা আক্তার (৩০) নামে খাগড়াছড়ির রামগড়ে দক্ষিণ বালুখালীর কালাপানি এলাকার এক নারীও ধর্ষিত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

২৫ আগস্ট রামগড় উপজেলার ২ নং পাতাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নং ওয়ার্ডের সদস্য ভারত কুমার চাকমাকে মানিকছড়ির বাটনাতলি ক্যাম্পে ডেকে নিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়।

২৫ আগস্ট মধ্য রাতে ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর সদস্যরা খাগড়াছড়ির লক্ষীছড়ি উপজেলাধীন বান্যাছোলা গ্রাম থেকে অন্তর চাকমা নামে ৪৫ বছর

বয়সী এক ব্যক্তিকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে।

আমাদের প্রশ্ন হলো, সমতলে গ্রাফিতি আঁকতে বাধা দেয়া না হলে, একই দেশের অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন বাধা দেয়া হবে?

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক দশমাংশ। তাই স্বাভাবিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে দেশে প্রকৃত ও অর্থবহ সংস্কার হতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাশাসন বা নিপীড়নমূলক অবস্থা জারি রেখে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে গণতন্ত্র কায়েম হওয়া অসম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণকে মুক্তি না দিয়ে সমতলের জনগণও প্রকৃত মুক্তি পেতে পারে না। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে হাসিনার সরকার পর্যন্ত বাংলাদেশের ইতিহাস তারই প্রমাণ দেয়। কাজেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের যে কোন সংস্কার পরিকল্পনায় কিংবা গণতন্ত্রায়নের প্রক্রিয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামেও আমূল সংস্কার আনতে হবে। তা নাহলে দেশে আবার আগের মতো ফ্যাসিস্ট রাজত্ব কায়েম হতে পারে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে দাবি:

এ কারণে আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামে সংস্কার কার্যক্রমের প্রাথমিক ও আশু পদক্ষেপ হিসেবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে নিম্নোক্ত দাবি জানাচ্ছি:

১) অবিলম্বে জুলাই-আগস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের সময় নিহত সকল শহীদের নাম প্রকাশ ও হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত ফ্যাসিস্টদের গ্রেফতার পূর্বক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

২) অবিলম্বে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলে আটক ইউপিডিএফ ও তার সহযোগি সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের মুক্তি দিতে হবে; আদালত থেকে জামিন লাভের পর জেল গেট থেকে পুনরায় গ্রেফতার বন্ধ করতে হবে; এবং ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে ইউপিডিএফ ও তার সহযোগি সংগঠনের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের নামে দায়ের করা সকল মিথ্যা মামলা ও হুলিয়া প্রত্যাহার করতে হবে। ৩) ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সৃষ্ট ঠ্যাঙাড়ে নব্য মুখোশ বাহিনী ও মগ পার্টি ভেঙে দিতে হবে এবং তাদের মধ্যে যারা খুন, গুম, অপহরণ ও সন্ত্রাসের সাথে জড়িত তাদের গ্রেফতার পূর্বক শাস্তি দিতে হবে।

৪) স্বনির্ভর গণহত্যা ও পানছড়িতে চার যুব নেতা হত্যাসহ ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত সকল হত্যাকান্ড ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করতে হবে এবং তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘকে যুক্ত করতে হবে।

৫) অবিলম্বে নির্দলীয়, সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ পুনর্গঠন করতে হবে।

৬) অবিলম্বে বান্দরবানে চলমান কেএনএফ-বিরোধী অভিযানের নামে বম জাতিগোষ্ঠীকে নিশানা করে জাতি-নিধন অভিযান বন্ধ করতে হবে এবং শিশু ও নারীসহ আটককৃত বমদের মুক্তি দিতে হবে।

৭) খাগড়াছড়ির রামগড়ে গৃহবধূকে ধর্ষণকারীদের গ্রেফতার এবং রাঙামাটি ও বান্দরবানে ধর্ষণ প্রচেষ্টার সাথে জড়িতদের শাস্তি দিতে হবে।

৮) পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য অপারেশন উত্তরণ বাতিল পূর্বক সেনাশাসন প্রত্যাহার ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ১১ দফা নির্দেশনা বাতিল করতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

Exit mobile version