ঢাকা : বাবা ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা, অথচ বিপরীত ধারার দল গঠনের কাজটিতে নেমেছিলেন এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। মহাসচিব হয়ে বিএনপি গোছানোর কাজটি তিনিই করেছিলেন। দলটি থেকে এমপি হয়েছিলেন, মন্ত্রী হয়েছিলেন, শেষে রাষ্ট্রপতির পদেও বসেছিলেন। কিন্তু সেই দলের সিদ্ধান্তেই রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে যেতে হয়েছিল তাকে।
বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরী দুই দশক আগে দলছুট হওয়ার পর বিকল্প ধারার সভাপতি হিসাবে ৯২ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন। ২০০২ সালের ২১ জুন বঙ্গভবন থেকে বিদায় বেলায় তিনি বলেছিলেন, সরকারের সঙ্গে তার বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
রাষ্ট্রপতি পদে তার দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ছিল মাত্র ২১৯ দিন। রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকারের পর তিনিই এত কম দিন বঙ্গভবনে ছিলেন। আর নিজের দল ক্ষমতায় থাকার পরও বিদায় নিতে বাধ্য হওয়া বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান একমাত্র বদরুদ্দোজা চৌধুরীই, যিনি বি চৌধুরী নামে বেশি পরিচিত।
২০০১ সালের ভোটে জিতে খালেদা জিয়া সরকার গঠনের সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ। তার মেয়াদ অবসানের পর ওই বছরের ১৪ নভেম্বর বিএনপির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন বি চৌধুরী। অভিশংসন এড়াতে ২০০২ সালের ২২ জুন তিনি পদত্যাগ করেন।
মুন্সীগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা কফিল উদ্দিন চৌধুরীর ছেলে বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাজনৈতিক সংস্রব এড়িয়ে চলছিলেন। বাবা যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী, ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদ সদস্য হলেও ছেলে বি চৌধুরী তার ক্যারিয়ার গড়েন চিকিৎসক হিসাবে। পাশাপাশি গত শতকের ষাটের দশকে টেলিভিশনে অনুষ্ঠান করেও হয়ে উঠেছিলেন জনপ্রিয় মুখ।
কফিল উদ্দিন চৌধুরী ১৯৭২ সালে মারা যাওয়ার পর বাংলাদেশে সচরাচর বাবার পায়ে জুতা গলানোর চল থাকলেও বি চৌধুরী সে পথে যাননি। কারণ হিসাবে তার বন্ধুদের কাছ থেকে জানা যায়, জাতীয় অধ্যাপক হতে চেয়েছিলেন বি চৌধুরী, কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তা না করায় তিনি হতাশ ছিলেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করার পর যখন দল গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেন, তখন আকস্মিকভাবে বি চৌধুরীর রাজনীতিতে পদার্পণ। প্রথমে সামরিক শাসক জিয়ার উপদেষ্টা হন তিনি, পরে উপপ্রধানমন্ত্রীও হন। ১৯৭৯ সালে জিয়া বিএনপি গঠন করে বি চৌধুরীকে মহাসচিব করে দল গোছানোর দায়িত্ব দেন। এই দল থেকে মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য হয়েছিলেন তিনি, মুন্সীগঞ্জে পৈত্রিক এলাকা থেকে।
জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির কাণ্ডারি খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে সরকার গঠনের পর বি চৌধুরীকে মন্ত্রী করার পাশাপাশি সংসদ উপনেতার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে বিএনপি বিরোধী দলে থাকাকালে তিনি ছিলেন বিরোধীদলীয় উপনেতা।
২০০১ সালে চারদলীয় জোট সরকার গঠনের পর বি চৌধুরীকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়েছিল। তখনও তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য। ওই বছরের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি বিএনপির সব পদ থেকে অব্যাহতি নেন।
বাধ্য হয়ে পদত্যাগ
নিয়ম অনুযায়ী, স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছিলেন বি চৌধুরী। তখন স্পিকারের দায়িত্বে ছিলেন মুহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার। সেই পদত্যাগপত্রে বি চৌধুরী লিখেছিলেন, “মাননীয় স্পিকার, ২০ জুন, ২০০২ তারিখে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি আজ ২১ জুন অপরাহ্ণে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করলাম।”
সেদিন প্রধানমন্ত্রী ও সরকার প্রধান খালেদা জিয়ার কাছেও একটি চিঠি দিয়েছিলেন বি চৌধুরী। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ২০ জুন রাতে বিএনপির সংসদীয় দলের সিদ্ধান্ত আমি জানতে পেরেছি। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হিসাবে, বিএনপির প্রতিষ্ঠালগ্নে পার্টির লাইসেন্স স্বাক্ষরকারী হিসাবে, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠতম সহযোগী হবার সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হিসাবে এবং গণতন্ত্রে দৃঢ়বিশ্বাসী একজন সচেতন নাগরিক হিসাবে আমি বিএনপির সংসদীয় দলের সিদ্ধান্তে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যগ করার পত্র মাননীয় স্পিকারের নিকট প্রেরণ করেছি।
রাষ্ট্রপতির সুদিনে ও দুর্দিনে ব্যক্তিগতভাবে আপনার ও আমাদের রাজনৈতিক কর্মীর ও নেতাদের সকলের এবং দেশবাসীর ঐকান্তিক সহযোগিতার জন্য আজকের এই দিনে আমি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।”
বি চৌধুরীর পদত্যাগের প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনও দলের পার্লামেন্টারি কমিটিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সংবিধানবিরোধী। রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করে বিএনপি দলীয় সংকটকে জাতীয় সংকটে পরিণত করেছে।
অন্যদিকে বি চৌধুরীর পদত্যাগে বিএনপি নেতারা স্বস্তি প্রকাশের খবর এসেছিল ২০০২ সালের ২২ জুন প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলোতে। পদত্যাগ করে বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে ঢাকার বারিধারায় নিজের বাড়িতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন বি চৌধুরী। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘বিরাট এক ভুল বোঝাবুঝি’ হয়েছে।
খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের সভাপতিত্বে বৈঠকে তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, তা নিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তিনি পাননি বলে জানান বি চৌধুরী।
তিনি বলেন, “যেকথা তারা বললেন, তার ব্যাখ্যা নিতে কেউ এল না। একজন সিনিয়র মন্ত্রীকে তো পাঠানো যেত আসল ঘটনা জানার জন্য।” তিনি নিজে দুবার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে টেলিফোন করেও কথা বলতে পারেননি বলে দাবি করেন বি চৌধুরী।
তার পদত্যাগের পর দৈনিক জনকণ্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, “বিএনপির উগ্রপন্থি এবং জুনিয়র গ্রুপের ক্যু এর শিকার হলেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এক্ষেত্রে কলকাঠি নেড়েছে প্যারালাল গভর্নমেন্ট হিসাবে পরিচিতি পাওয়া প্রভাবশালী বিশেষ মহলটি।”
কেন ক্ষুব্ধ ছিল বিএনপি?
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর বি চৌধুরী বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যাননি, ভাষণে জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলেননি- শুরুতে এনিয়ে বিএনপি নেতাদের ক্ষোভ ছিল। এর সঙ্গে পরে আরও নানা উপাদান যোগ হয়।
তখনকার সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংসদীয় দলের বৈঠকে আরও যে সব বিষয় নিয়ে বি চৌধুরীকে নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছিল, তার মধ্যে রয়েছে- মুন্সীগঞ্জে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়ে রাষ্ট্রপতির ছেলে সংসদ সদস্য মাহী বি চৌধুরীর তোরণ নির্মাণ, খালেদা জিয়া চিকিৎসা নিয়ে দেশে ফেরার পর তার খবর না নেওয়া, রাষ্ট্রপতির বিভিন্ন বক্তব্যে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ না বলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আফতাব আহমদকে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের ফাইলে স্বাক্ষর না করা, বাংলাদেশ টেলিভিশনে বেশি কভারেজ পাওয়া, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের বাইরে নানা অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া, রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যয় বাড়ানো ইত্যাদি।
তখন প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সংসদীয় দলের বৈঠকে আলোচনার সূত্রপাত ঘটান তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। তারপর ১৫ জন সংসদ সদস্য বক্তব্য দেন। সবাই বি চৌধুরীর বিরুদ্ধেই বলেন।
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান বলেছিলেন, “স্রষ্টার সাথে সৃষ্টি বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না। কিন্তু তিনি (বদরুদ্দোজা চৌধুরী) জিয়াউর রহমানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।”
বিএনপির তৎকালীন নেতা অলি আহমদ বলেছিলেন, “বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে যেতে হবে, নইলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।”
তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মতিন চৌধুরী বলেন, “আমি আগেই বলেছিলাম তাকে প্রেসিডেন্ট বানানো ঠিক হবে না। আমার কথা ফলেছে।” এছাড়া খন্দকার মোশারফ হোসেন, নাজমুল হুদাও রাষ্ট্রপতির সমালোচনায় সরব ছিলেন।
সংসদ সদস্য হিসাবে বদরুদ্দোজার ছেলে মাহীও ওই বৈঠকে ছিলেন। দৈনিক ইত্তেফাকে তখন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাহী সভা শেষে বেরিয়ে তার বাবাকে ফোন করে বলেন, “আব্বা, তোমার পক্ষে কথা বলার কেউ নেই, তোমার পদত্যাগ করাই ভালো।”
বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভুঁইয়া দলের সিদ্ধান্ত জানিয়ে সাংবাদিকদের সেদিন বলেছিলেন, “রাষ্ট্রপতি দলের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে যে অবস্থান নিয়েছেন, তা ক্ষমাহীন ব্যাপার। ভুলেরও একটা মাত্রা আছে। তিনি সে মাত্রা ছাড়িয়ে গেছেন।”
বিএনপির সংসদীয় দলের সভা শেষে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে সর্বসম্মতিক্রমে আহ্বান জানানো হয়। তৎকালীন প্রধান হুইপ খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের স্বাক্ষর করা একটি চিঠি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়।
ওই চিঠিতে বলা হয়েছিলো, “১৯ এবং ২০শে জুন দলের সভায় বিস্তারিত আলোচনার পরে এই মর্মে সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, বিএনপি সংসদীয় দল মাননীয় প্রেসিডেন্ট এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর উপরে আস্থা হারিয়েছে বিধায় তাকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অবিলম্বে পদত্যাগের আহবান জানানো হচ্ছে।”
খালেদা জিয়া চাননি?
২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিকল্প না পেয়ে রাষ্ট্রপতি পদে বি চৌধুরীকে বসিয়েছিল বলে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়। তাতে লেখা হয়েছিল, সাহাবউদ্দীন আহমদকে আরও ছ য়মাস রাষ্ট্রপতি রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল বিএনপি, কিন্তু তিনি ওই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
বি চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হওয়ার ইচ্ছা আভাসে-ইঙ্গিতে প্রকাশ করলেও খালেদা জিয়া রাজি ছিলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যুৎসই কোনও প্রার্থী না পাওয়ায় বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বেছে নিতে বাধ্য হন খালেদা জিয়া।
তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বি চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন বলে খালেদা জিয়ার মনে হয়েছিল। এক্ষেত্রে বি চৌধুরীর বিদায়ের পর ২৯ জুন খালেদা জিয়ার এক বক্তব্যের দিকে অনেকে ইঙ্গিত করেন।
সেদিন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, “যে যত বড়ই হোক না কেন, ষড়যন্ত্র করে কেউ পার পাবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের শেকড় কেটে দেওয়া হয়েছে।”
বি চৌধুরী ২০০৬ সালে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আমি রাষ্ট্রপতি হওয়ার পরে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে আবেদন জানাল, আমি যেন চ্যান্সেলর হিসাবে সেখানে ডিগ্রিগুলো দিতে যাই। আমি সেগুলো করেছি।
“কিছুদিন পরে একজন মন্ত্রী আমার কাছে এলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে বললেন যে আমি যেন এত বেশি এক্সপোজড না হই অর্থাৎ এ ধরনের অনুষ্ঠান যেন আমি না করি।”

