ঢাকা : জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের পক্ষ থেকে আপনাদেরকে স্বাগত জানাচ্ছি। আপনাদের সহায়তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আমরা আশা করবো অতীতের ন্যায় সকল সময় আপনারা আমাদের সাথে থাকবেন।
আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে কমিশন নিয়মিতভাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কমিশনের কাজের অগ্রগতি প্রকাশ করবে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা ২য় সংবাদ সম্মেলনে আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি।
অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রদানের পর আপনাদের জন্য প্রশ্নোত্তর পর্ব রয়েছে যেখানে আমরা খোলা মনে আলোচনা করবো।
কাজের অগ্রগতি : প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে। ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় কমিশন কার্যক্রম শুরু করেছে এবং সকল কার্যক্রম অদ্যাবধি চলমান রয়েছে।
কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা: কমিশন গঠন এবং পদমর্যাদা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন কমিশন গঠনের প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ এবং সেই তারিখ থেকেই কার্যক্রম শুরু হয়।
কমিশনের কর্মপরিধি , ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআর সদর দপ্তর, পিলখানায় সংগঠিত ঘটনার স্বরূপ উদ্ঘাটন।
ঘটনাকালে সংঘটিত হত্যাকান্ড ও অন্যান্য অপরাধ সংঘটনকারী, সহায়তাকারী, ষড়যন্ত্রকারী, ঘটনার আলামত ধ্বংসকারী, ইন্ধনদাতা এবং ঘটনা সংশ্লিষ্ট অপরাপর বিষয়সহ দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্ট অপরাধী ব্যক্তি, গোষ্ঠী,সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, বিভাগ সংগঠন ইত্যাদি চিহ্নিতকরণ।
উক্ত ঘটনায় হত্যাকান্ডের সময় ও হত্যাকান্ডের আগে পরে সংঘটিত অপরাপর অপরাধের স্বরুপ উদঘাটন, দায়ী ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, বিভাগ, সংগঠন চিহ্নিত করা এবং ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা বা ঘটনা ঘটাতে সহায়তাকারী অন্যান্য দেশী-বিদেশী ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সংস্থা, প্রতিষ্ঠান, বিভাগ, সংগঠনের সম্পৃক্ততা নিরূপন এবং দোষীদের চিহ্নিতকরণ।
হত্যাকান্ডসহ সংঘটিত অপরাপর অপরাধ প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার জন্য দায়ী ব্যক্তি/গোষ্ঠী/সংস্থা/প্রতিষ্ঠান/বিভাগ/সংগঠন চিহ্নিতকরণ।
হত্যাকান্ডসহ সংঘটিত অপরাপর অপরাধের জন্য ইতোমধ্যে দায়েরকৃত মামলা এবং সংশ্লিষ্ট মামলায় অভিযুক্তগণের দায়/অপরাধ অক্ষুণ্ণ রেখে সংশ্লিষ্ট মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এমন প্রকৃত অপরাধীদেরকে তদন্ত প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তকরণ।
সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ কমিশন সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং সাক্ষ্য প্রমাণসহ দায়ী ব্যক্তিবর্গের নাম উদঘাটনের চেষ্টা করছেঃ
বেঁচে ফিরে আসা ব্যক্তি বর্গসা
মরিক বাহিনীর কমান্ড
ব্যাব এবং পুলিশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ ডিজিএফআই
এন এস আই
হুকুমদাতা
সামরিক অপারেশনে বাধাদানকারী
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা
বিদেশী সংশ্লিষ্টতা
একই সাথে কমিশন সংশ্লিষ্ট সেনা আইন ভঙ্গের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে।
মোট কার্য দিবসঃ ২৪ ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে এ পর্যন্ত কমিশন প্রায় ৪১ কার্য দিবস পেয়েছে।
কমিশনের তদন্তের অগ্রগতিঃ এই সময়ের মধ্যে কমিশন নিম্নলিখিত কার্যক্রম সম্পন্ন করেছেঃ
কমিশনে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি: কমিশনের কাজের সুবিধার্থে ২৩ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে একজন নতুন
সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তথ্য সংগ্রহ পরিকল্পনা তৈরি:
কমিশন একটি তথ্য সংগ্রহ পরিকল্পনা তৈরি করেছে এবং উক্ত পরিকল্পনার আওতায় সাক্ষ্য গ্রহণ এবং তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে।
তথ্য সংগ্রহ পরিকল্পনায় পর্যায়ক্রমে সম্ভাব্য সকল ব্যক্তিকে আহ্বান করা হবে। এই তালিকা প্রতিটি সাক্ষীর বক্তব্যের ভিত্তিতে হালনাগাদ করা হচ্ছে। অনেকেই হয়ত ভাবছেন কেন তাঁদেরকে এখনও কমিশন কর্তৃক তাঁদের ডাকা হয়নি, তাদের জন্য বলছি, আপনারা অপেক্ষা করুন এবং নিশ্চিত থাকুন যে তথ্য সংগ্রহ পরিকল্পনার সময় সূচি অনুযায়ী আপনাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে।
এছাড়াও যে কেউ আমাদের ওয়েবসাইটের (bdr-commission.org) মাধ্যমে তথ্য দিতে পারবেন এবং আমাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন।
তথ্য ব্যবস্থাপণার জন্য “Investigation Management System” তৈরিঃ সংগৃহীত তথ্যের তথ্য ভান্ডার
পর্যালোচনা, তথ্যের ম্যাচিং, লিঙ্কিং, সত্যতা যাচাই এবং ভবিষ্যত সংরক্ষণের জন্য কমিশন ‘Investigation Management System” এর উপর একটি সফটওয়্যার তৈরি করেছে যা কাজের নির্ভুলতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
সাক্ষ্য গ্রহণের প্রতিবেদনঃ এ পর্যন্ত সর্বমোট ৩৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছেঃ
১। পদবি লেঃ জেনারেল = ৩
২। মেজর জেনারেল। = ২
৩। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল = ৫
8। কর্নেল = ৪
৫। লেঃ কর্নেল = ৪
৬ । মেজর = ৭
৭। ক্যাপ্টেন = ২
৮। বিডিআর সদস্য = ৭
৯। শহীদ পরিবারের সদস্য = ৩
ঙ। বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা: বিভিন্ন ব্যক্তির উপর বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়েছে।
চ। গণবিজ্ঞপ্তিঃ কমিশন ইতোমধ্যে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তথ্য প্রদানের জন্য সকলকে আহ্বান করা হয়েছে। গণবিজ্ঞপ্তি আপনাদের অবগতির জন্য সংযুক্ত করা হলো। আমি অনুরোধ করবো, আপনারা তথ্য প্রদানের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে উৎসাহিত করবেন। এই বিষয়ে আপনাদের সহযোগিতা একান্ত কাম্য।
ছ। সংশ্লিষ্ট সকলের বক্তব্য গ্রহণ: কমিশন গুরুত্বপূর্ণ সকল ব্যক্তিকে সাক্ষ্য গ্রহনের প্রয়োজনে আমন্ত্রণ জানাবে। এই বিষয়ে সবাইকে ধৈর্য ধারণের জন্য অনুরোধ করা হলো। এখানে উল্লেখ্য যে, যে কেউ ওয়েব সাইটের মাধ্যমে তথ্য দিতে পারবেন। আমাদের ওয়েবসাইটঃ bdr-commission.org
জ। সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ/কর্তৃপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণঃ কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ/কর্তৃপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ করবে এবং ইতোমধ্যে কিছু মন্ত্রণালয়ে তথ্য চেয়ে চিঠি লেখা হয়েছে এবং আরও চিঠি প্রক্রিয়াধীন আছে।
৬। চ্যালেঞ্জঃ
ক। প্রশাসনিক সহায়তাঃ
ক্রয়প্রক্রিয়া সময় সাপেক্ষ হলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদেরকে সকল প্রকার সহায়তা প্রদান করছে। কিছু প্রশাসনিক সহায়তা প্রদানের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে বলে জানা গেছে। আমাদের বিশ্বাস সকল কার্যক্রম দ্রুত সমাধান হবে।
উল্লখ্য যে কমিশন সদস্যগণ নিজেদের আইসিটি সামগ্রী দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। কাজের গুরুত্ব এবং সময়ের সীমাবদ্ধতার কারনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অবগতির মাধ্যমে কমিশন প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং আমাদের বিশ্বাস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
খ। বিদেশী দূতাবাসের সাথে যোগাযোগঃ
কিছু বিদেশী দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করার বিষয়ে কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে এবং ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি লেখা হয়েছে।
গ। প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার তথ্য পর্যালোচনাঃ
প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াতে প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। কমিশন যতদূর সম্ভব প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সকল তথ্য সংগ্রহ এবং পর্যালোচনা করার পরিকল্পনা করেছে। আমাদের বিশ্বাস আমরা সন্তোষজনক ভাবে এই কাজ করতে সক্ষম হবো।
ঘ। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মৃত্যুবরণ/পলাতক/বিদেশে পলায়ন/বিস্মৃতিঃ
উল্লেখ্য যে ইতোমধ্যে অনেক সাক্ষী এবং ঘটনার সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন, পলাতক আছেন এবং বিদেশে পালিয়ে আছেন/বিদেশে অবস্থান করছেন। তাদের সাক্ষ্য গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়বে বা বিলম্বিত হবে এবং অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব হয়ে পড়বে এমন ধারণা করা যায়। এছাড়াও সময়ের বিবর্তনে অনেক সাক্ষীর পক্ষে সঠিক তারিখ, সময় এবং ঘটনার অনেক বিষয় স্মরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
৭। উপসংহারঃ
১৬ বৎসর পূর্বে সংঘটিত ঘটনার তথ্য উদঘাটন জটিল হলেও কমিশন অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাচ্ছে যাতে করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে সত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়।
উৎসাহজনক বিষয় হচ্ছে যে অফিসারসহ অনেক ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে সেই সময় সকল প্রতিকূলতার মাঝেও প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আলামত সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ করেছিলেন যা আমাদের কাছে এসেছে এবং আসছে। তাঁরা কৃতিত্বের দাবীদার এবং তাঁদের অবদান সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণে ভূমিকা রাখবে বলে আমাদের বিশ্বাস। কমিশন তাদেরকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে।
আমাদের উপর আস্থা রাখুন। কমিশনের সকল সদস্য সর্বোচ্চ সততা, দক্ষতা এবং সাহসের সাথে নিজ দায়িত্ব পালনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
আমরা সত্য উদঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে সক্ষম হবো, ইনশাল্লাহ।
সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, আপনাদেরকে আবারও অনেক ধন্যবাদ। আমাদের অনুরোধ আপনারা সঠিক তথ্য প্রকাশে অবিচল থাকবেন এবং আমাদেরকে সহায়তা করে যাবেন। আমরা আরও অনুরোধ করবো আপনারা আমাদের গণবিজ্ঞপ্তি প্রচারে সাহায্য করবেন যাতে করে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তি কমিশনকে তথ্য প্রদান করার জন্য উৎসাহিত হয়।