Site icon Daily Dhaka Press

বিজয় অর্জিত হোক সব জায়গায়

তৌফিক অপু :১৬ ডিসেম্বর—বাঙালি জাতির গৌরবের দিন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশ অর্জন করে চূড়ান্ত বিজয়। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, নির্যাতিত মা-বোনের বেদনা আর অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার অদম্য সাহসের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ডের মুক্তি নয়—এটি ছিল শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের অপ্রতিরোধ্য জয়ের ঘোষণা।

আজ ৫৪ বছর পর দাঁড়িয়ে বিজয় দিবস আমাদের সামনে প্রশ্ন তোলে—আমরা কি সেই বিজয়ের চেতনা যথাযথভাবে ধারণ করতে পেরেছি? বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে উন্নয়নের যেমন অগ্রগতি আছে, তেমনি আছে গভীর কিছু সংকট ও চ্যালেঞ্জ। অবকাঠামো উন্নয়ন, ডিজিটাল সংযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে বিস্তারের মতো অর্জনগুলো আমাদের সামনে আশার আলো দেখায়। কিন্তু একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, দুর্নীতি, মানবাধিকার প্রশ্ন, সামাজিক বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিক চর্চার সংকট সাধারণ মানুষের জীবনে চাপ সৃষ্টি করছে।

বিজয় দিবসের মূল শিক্ষা ছিল—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন। অথচ বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাই, সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়ছে, তরুণদের একটি বড় অংশ ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ, আর ন্যায়বিচার পেতে সাধারণ মানুষের সংগ্রাম এখনও সহজ নয়। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ যেখানে মানুষ হবে রাষ্ট্রের মূল শক্তি—সেই ধারণা বাস্তবায়নে আমাদের আরও পথ পাড়ি দিতে হবে।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশ নানা ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব এবং আঞ্চলিক রাজনীতির টানাপোড়েন দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলছে। এ অবস্থায় বিজয় দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সংকটের মুখে ঐক্যই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। ১৯৭১ সালে বিভক্ত থাকলে বিজয় আসত না; আজও জাতীয় ঐক্য ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বিজয় দিবস মানে শুধু অতীতের গৌরব স্মরণ নয়, বরং বর্তমানের দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের অঙ্গীকার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তখনই অর্থবহ হবে, যখন রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত থাকবে, মানবাধিকার রক্ষা পাবে এবং তরুণ প্রজন্ম দেশ গঠনে সমান সুযোগ পাবে। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে—অন্যায়ের সঙ্গে আপস করলে বিজয় অর্থহীন হয়ে যায়।

আজকের এই দিনে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। যেখানে বিজয়ের চেতনা থাকবে কেবল স্মৃতিস্তম্ভে নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। সেটিই হবে বিজয় দিবসের প্রকৃত সম্মান।

Exit mobile version