Site icon Daily Dhaka Press

খুশীর ঈদের চাঁদ উঠেছে খোকা-খুকি কই..

Screenshot

খান মোহাম্মদ সালেক: ঈদ সব মুসলমানের জন্যই একটি আনন্দ উৎসবের দিন। আর এই আনন্দটা সবচেয়ে বেশী উপভোগ করে শিশুরাই। তাই ঈদ এলেই শৈশবের ঈদ আনন্দের কথা মনে পড়ে যায়। আমার শৈশব কেটেছে টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্র আকুর টাকুরে। তখন মহকুমা শহর। শহর জুড়ে ছিল খোকসা জঙ্গল, কাশবন আর বিস্তির্ণ ফসলি জমি। শেয়াল, খাট্টাস, বাগদাশা, বেজি, গুই সাপসহ নানা ধরণের বিষাক্ত সাপ দেখা যেত শহরে। শহরের বুক চিড়ে প্রবাহিত লৌহজং নদীর সাথে যুক্ত ছিল অনেক খাল যা ছিল নৌপথ। সরকারী দালান-কোঠা ছাড়া হাতে গোনা কয়েকটি দালান বাড়ি, বাকি অধিকাংশই টিনের ঘর কিংবা তালাই বাঁশের বেড়া দিয়ে তৈরি। প্রায় সব বাড়ির আঙ্গিনায় ছিল ফুলের বাগান। গাছ গাছালিতে ভরা ছিল বাড়িগুলো। কয়েকটি পাকা সড়ক ছাড়া অধিকাংশ সড়কই ছিল কাঁচা ও ইটের খোয়া বিছানো। শহর কাঁপানো প্রচন্ড শব্দের ডায়নামা চালিত বিদ্যুৎ ছিল অল্প কিছু এলাকায়। সরকারী জীপ ছাড়া বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়ি, সাইকেল ও রিকসা। গ্যালারিবিহীন স্টেডিয়াম ছিল টিনের বেড়ায় ঘেরা যা একবার ঝড়ে উড়ে যাওয়ার পর ছিল উম্মুক্ত। স্টেডিয়ামের পাশে শিশু পার্ক যেখানে আমরা নানা হস্তচালিত রাইডে চড়ে উল্লাসে মেতে উঠতাম। তার পাশেই বর্তমান ঈদগাহ ময়দান।
গ্রামীণ পরিবেশের এই শহরে আমার শৈশবের ঈদ আর বর্তমান শিশুদের ঈদের অনুভূতির মধ্যে ফারাক অনেক। ওরা কষ্ট করে ঈদের চাঁদ দেখার কথা কল্পনাও করে না। আর আমরা চাঁদ না দেখলে ঈদটাই মনে হতো বৃথা। চাওয়ার আগেই কয়েক সেট পোশাক পেয়ে যায় ওরা। আর আমরা এক সেট নতুন পোশাকের জন্য চেয়ে থাকতাম বাবার দিকে।
সবে মেরাজেই আমাদের হৃদপি-ে আনন্দের হাওয়া দোলা দিতো যেন এগিয়ে আসছে ঈদ। রোজা ও ঈদ ঘিরে প্রথম আনন্দের অনুভূতি ছিল স্কুলের লম্বা ছুটি। শৈশবে রোজা করতে না পারলেও সন্ধ্যায় মজার মজার ইফতার সামগ্রীর জন্য অপেক্ষা করতাম। রোজার মধ্যেই নতুন পোশাকের অপেক্ষা। বাবার বন্ধু শ্রদ্ধেয়জন মোহাম্মদ আলীর একটি টেইলার ছিল ক্লাব রোডে। আর মসজিদ রোডে বসতেন বাসু দেব। কখনও তাদের কাছে চলে যেতাম বাবার হাত ধরে, আবার কখনও তারা বাড়িতে এসে আদর করে পোশাকের মাপ নিয়ে যেতেন। আমাদের বাছাই করা রং-এর কাপড়ই কিনে দিতেন বাবা। নিউ মার্কেটে কিছু পোশাকের দোকান ছিল। ১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হওয়ার পর ঈদ উৎসবেও আসে ভিন্ন আনন্দ। কয়েকটি আধুনিক পোশাকের দোকান হয় শহরে। ঈদের পোশাক হাতে পেলে তা অতি যতেœ রেখে দিতাম। নতুন পোশাক পেলেও পুরনো কাপড় ধুয়ে কয়লার ইস্ত্রি দিয়ে ইস্ত্রি করতাম ঈদের আগেই। পাশের ধোপাবাড়িতেও কিছু কাপড় দেয়া হতো। ওদিকে মেহেদি পাতা পাটায় বেটে হাতে লাগানোর কাজটি করতেন আপু। এক সময় ডাকযোগে প্রিয়জনদের কাছ থেকে বর্ণিল ঈদ কার্ড বাড়তি আনন্দ যোগায়, ঈদ কার্ড পাঠানোর অভ্যাস গড়ে তুললাম নিজেও।
ঈদের আগের দিন কেনা হতো কালিজিরার চাল, লোরেক্স সেমাই, ঘি, গুড় চিনি, জাফরান, আতর, টুপি আরও কত কী! ওই সময়ে ঘি ছাড়া পোলাও রান্নার কথা কেউ ভাবতেও পারতেন না। বিকেল গড়াতেই বাড়ির পশ্চিমে বাঁশ ঝাড় পেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম এক ফালি চাঁদ দেখার জন্য। কে সবার আগে চাঁদ দেখতে পারে তা নিয়েও ছিল প্রতিযেগিতা। চাঁদ দেখার পরই বেতারে প্রচারিত হতো কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ…।’ আরও ভেসে আসতো ‘বাক কুম কুম পায়রা ডাকে ঘরের চালে ওই, খুশীর ঈদের চাঁদ উঠেছে খোকা-খুকি কই…’ গানটি। ওই গানটিতে শিশু কিশোরদের ঈদ আনন্দের একটা বিবরণ থাকতো। আর আমিও গানের কথাগুলো অনুসরণ করে ঈদের দিনে কী কী করবো তা সাজিয়ে নিতাম। বাড়ি জুড়ে তখন মা এবং আপুর রান্নার গন্ধ!
রাত পোহালেই গোসল করে নতুন পোশাক পড়ে তৈরি হতেই মা টেবিলে সাজাতেন নানা পদের খাবার। অন্যদিকে আপু বাগান থেকে ফুল নিয়ে সাজিয়ে দিতেন প্রতিটি ঘর। মায়ের হাতের সেমাই পায়েস খেয়ে মা-বাবাকে সেলাম করে বাবার হাত ধরে রওনা দিতাম ঈদগাহ ময়দানে। মাইকে টাঙ্গাইল জামে মসজিদের ঈমাম মাওলানা আজিম উদ্দিনের বয়ান শুনতে শুনতে পৌঁছে যেতাম ঈদগাহ ময়দানে। সব শ্রেণী-পেশার হাজারো মানুষের এক কাতারে দাড়িয়ে নামাজ আদায় আর নামাজের পর মোলাকাতে হৃদয়ে পবিত্রতা ও আনন্দের হাওয়া দোলা দিত। মায়ের হাতের পোলাও, কোরমা, জর্দা, সেমাই ছাড়াও দিঘুলিয়ায় নানা বাড়িতে নানীর হাতের আর কলেজ পাড়ায় চাচার বাড়িতে চাচীআম্মার হাতের মজার খাবার না খেলে ঈদ অপূর্ণ মনে হতো।
আত্মীয়, প্রতিবেশী বা বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে মুরুব্বীদের সেলাম করা, মজার মজার খাবার খাওয়া ছিল ঈদের আনন্দেরই অংশ। সব বয়সী মানুষের একত্রিত হওয়ার মধ্য দিয়ে শিশুদের আদব কায়দা শেখারও একটা পরিবেশ তৈরি হতো ঈদে। সন্ধ্যায় বেদনার সুর, শেষ হয়ে যাচ্ছে ঈদ। যদিও কয়েকদিন চলতো ঈদের আমেজ। ঈদের পর প্রথম স্কুল খোলার দিন নতুন পোশাক পড়ে স্কুলে যাওয়ার মধ্যেও ঈদের আনন্দ খুঁজতাম।

Exit mobile version