
গত ১২ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রূপপুর প্রকল্পে “৮০ হাজার টাকার বালিশ” কেনার প্রসঙ্গ টেনে যে প্রশ্ন তুলেছেন-“৮০ হাজার টাকার বালিশে কি ঘুম হয়?” তা নিছক একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি গোটা রাষ্ট্র ব্যবস্থার গভীরে জমে থাকা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের বহুদিনের ক্ষোভের প্রতিধ্বনি।
একটি রাষ্ট্র যখন উন্নয়নের নামে অস্বাভাবিক ব্যয়ের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন সেখানে প্রকল্পের চেয়ে কমিশন বড় হয়ে যায়, প্রয়োজনের চেয়ে বিল বড় হয়ে যায়, আর জনগণের স্বপ্নের চেয়ে দুর্নীতিবাজদের ব্যাংক ব্যালেন্স দ্রুত বাড়তে থাকে। রূপপুরের বালিশ আজ শুধু একটি বালিশ নয়; এটি অপচয়, অনিয়ম ও রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ হয়তো অর্থনীতির জটিল হিসাব বোঝেন না, কিন্তু তারা এতটুকু বোঝেন—যে দেশে একজন কৃষক সার কিনতে হিমশিম খায়, একজন দিনমজুর সন্তানের চিকিৎসা করাতে পারে না, একজন শিক্ষিত তরুণ চাকরির আশায় বছরের পর বছর ঘুরে বেড়ায়, সেই দেশে একটি বালিশের দাম ৮০ হাজার টাকা হতে পারে না। এটি উন্নয়ন নয়, এটি জনগণের ট্যাক্সের অর্থকে নির্মমভাবে উপহাস করা।
মেগা প্রকল্পগুলোর শুরুতে জনগণ স্বপ্ন দেখে। বলা হয়, এসব প্রকল্প দেশের অর্থনীতিকে বদলে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ক্ষেত্রেই প্রকল্পের ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কাজ শেষ হতে সময় লাগে বছরের পর বছর। অথচ জনগণ জানতে পারে না—কেন ব্যয় বাড়লো, কারা লাভবান হলো, কারা দায়ী। এই অস্বচ্ছতার সুযোগেই জন্ম নেয় দুর্নীতির মহোৎসব।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল কিংবা আরও অনেক বড় প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী মত দমন, প্রশাসনিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের কারণে সেই প্রশ্নগুলো অনেক সময় চাপা পড়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম সত্য হলো—দুর্নীতির গন্ধ কখনো পুরোপুরি চাপা থাকে না। একসময় তা বেরিয়েই আসে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, উন্নয়নকে বাংলাদেশে অনেক সময় রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নত করে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। কেবল বড় বড় স্থাপনা নির্মাণ করলেই উন্নয়ন হয় না; যদি সেই উন্নয়নের পেছনে জনগণের রক্ত-ঘামের অর্থ লুটপাট হয়ে যায়, তাহলে সেটি উন্নয়ন নয়, বরং অর্থনৈতিক বৈষম্যের এক ভয়ংকর আয়োজন।
আজ দেশের মানুষ উচ্চমূল্যের চাপে দিশেহারা। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম লাগামহীন। মধ্যবিত্ত শ্রেণি নীরবে ভেঙে পড়ছে। তরুণ সমাজ হতাশায় আক্রান্ত। বৈদেশিক ঋণের চাপ বাড়ছে। অথচ রাষ্ট্রের একটি অংশ বিলাসী প্রকল্পের নামে অপচয়ের উৎসবে ব্যস্ত ছিল—এ অভিযোগ এখন আর গোপন কিছু নয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে তাই রাজনৈতিক বার্তার পাশাপাশি একটি নৈতিক প্রশ্নও উঠে এসেছে—রাষ্ট্র কি জনগণের কল্যাণে পরিচালিত হবে, নাকি ক্ষমতাকেন্দ্রিক লুটপাটের যন্ত্রে পরিণত হবে?
বাংলাদেশের মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু সেই উন্নয়ন হতে হবে সৎ, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক। জনগণ এমন উন্নয়ন চায় না, যেখানে হাসপাতালের বেড নেই কিন্তু প্রকল্পে বিলাসবহুল আসবাব আছে; স্কুলে শিক্ষক নেই কিন্তু প্রকল্পে অস্বাভাবিক পরামর্শক ব্যয় আছে; গ্রামে কর্মসংস্থান নেই কিন্তু শহরে কাগুজে উন্নয়নের উৎসব চলছে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, দুর্নীতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধেই এসে পড়ে। সরকার ঋণ নেয়, প্রকল্পের ব্যয় বাড়ে, তারপর সেই ঋণ শোধ করতে বাড়ে কর, বাড়ে দ্রব্যমূল্য, কমে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা। অর্থাৎ দুর্নীতির সুবিধা ভোগ করে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী, কিন্তু তার মূল্য দেয় পুরো জাতি।
রাষ্ট্র পরিচালনায় এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা। প্রতিটি বড় প্রকল্পের ব্যয়, দরপত্র, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্টদের সম্পদের হিসাব জনগণের সামনে উন্মুক্ত করতে হবে। অন্যথায় “৮০ হাজার টাকার বালিশ” শুধু একটি উদাহরণ হয়েই থাকবে না; এটি ভবিষ্যতের আরও বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়াবে।
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো রাষ্ট্র কেবল ইট-পাথরের উন্নয়নে টিকে থাকে না। একটি রাষ্ট্র টিকে থাকে ন্যায়বিচার, সততা এবং জনগণের আস্থার ওপর। সেই আস্থা একবার ভেঙে গেলে হাজার মেগা প্রকল্প দিয়েও তা ফিরিয়ে আনা যায় না।
আজ সময় এসেছে উন্নয়নের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণের। এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে জনগণের টাকা জনগণের কল্যাণে ব্যয় হবে; যেখানে একটি বালিশের দাম শুনে মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়বে না; যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি টাকার হিসাব থাকবে জনগণের কাছে।
কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই-
“৮০ হাজার টাকার বালিশে আসলেই কি ঘুম হয়?
না-কি সেই বালিশের নিচে চাপা পড়ে থাকে কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস?”
রোটারিয়ান এম নাজমুল হাসান
বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
প্রকাশক : মোহাম্মদ বদরুজ্জামান তালুকদার
সম্পাদক : খান মোহাম্মদ সালেক
Copyright © 2026 Daily Dhaka Press. All rights reserved.