ঢাকা, ০৪ জুন ২০২৬: রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে পাশবিক নির্যাতনের পর নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে বিচারক মাসরুর সালেকীন চাঞ্চল্যকর এই মামলার রায়ের জন্য আগামী রবিবার দিন ধার্য করেছেন।
আদালতে যুক্তিতর্ক ও শুনানি আজ বেলা পৌনে ১২টার দিকে বিচারক এজলাসে আসন গ্রহণ করলে কারাগার থেকে আনা দুই আসামি—সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। তাদের উপস্থিতিতেই শুরু হয় যুক্তিতর্ক।
রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানি করেন বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুর রহমান দুলু। ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি তুলে ধরে তিনি আদালতকে বলেন, প্রধান আসামি সোহেল রানা অবুঝ শিশু রামিসাকে বাথরুমে নিয়ে ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করে। এরপর জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সে। এই পুরো নারকীয় হত্যাযজ্ঞে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেছেন তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরায় তাদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ উভয় আসামির মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাশা করছে। এ সময় ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ওমর ফারুক ফারুকীও আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্লাহ। তিনি দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরির কোনো ফরেনসিক পরীক্ষা ছাড়াই কেবল জবানবন্দির ওপর ভিত্তি করে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সময় প্রধান আসামি সোহেল নেশাগ্রস্ত ছিল দাবি করে তার মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চাওয়া হয়। পাশাপাশি, স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে লাশ গুমের চেষ্টা ছাড়া অন্য কোনো অভিযোগ না থাকায় তাকে দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় লঘু শাস্তির আবেদন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।
দ্রুত বিচারিক কার্যক্রম মামলাটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিচারিক কার্যক্রম পার করেছে। গত সোমবার (১ জুন) আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। ওই দিন আসামিরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছিল। এরপর মঙ্গলবার (২ জুন) নিহত রামিসার বাবা-মা ও বোনসহ মোট ১৬ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেন আদালত। বুধবার (৩ জুন) ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয় এবং আজ বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের দিনক্ষণ ঠিক করা হলো।
নৃশংস সেই ঘটনার পেছনের কথা মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাসা থেকে বের হলে পাঁচতলা ভবনের তৃতীয় তলার একটি কক্ষে রামিসাকে কৌশলে ডেকে নেয় সোহেল রানা। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মেয়েকে খুঁজতে খুঁজতে ওই কক্ষের সামনে গিয়ে সন্দেহ হলে ডাকাডাকি করেন রামিসার মা। কোনো সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীদের সহায়তায় দরজা খুললে ভেতরে এক মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে পান তারা। সেখানে বিছানায় রামিসার মাথাবিহীন দেহ এবং একটি বালতির ভেতর তার কাটা মাথা পড়ে ছিল। ওই সময় কক্ষেই উপস্থিত ছিল স্বপ্না।
ঘটনার দিনই রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে স্বপ্নাকে এবং পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে মূল ঘাতক সোহেলকে গ্রেপ্তার করে। ২০ মে আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেয় সোহেল। এরপর মাত্র কয়েকদিনের মাথায়, ২৪ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অহিদুজ্জামান আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন, যার ফলশ্রুতিতে আজ মামলাটি রায়ের পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।

