সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফটোকার্ড ও কিছু পোস্টকে কেন্দ্র করে তীব্র বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে যে, রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও বাংলামোটর এলাকায় স্থাপিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) ট্রাফিক ক্যামেরাগুলো চিরতরে বন্ধ বা স্থগিত করা হয়েছে।
কিছু পোস্টে তো এমন অভিযোগও তোলা হয় যে, মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা অনৈতিক সুবিধা বা অনিয়মে জড়ানোর স্বার্থে এই আধুনিক প্রযুক্তি ম্যানুয়ালি বন্ধ করে রাখছেন। তবে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ এই তথ্যকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ডিএমপির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত বা স্থায়ী স্থগিতকরণের জন্য নয়, বরং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ লাইনের মাটির নিচের কিছু কারিগরি কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত ক্যামেরাগুলোর সংযোগ তার কেটে গিয়েছিল।
সাময়িক সেই ত্রুটি দ্রুততম সময়ে সারিয়ে বর্তমানে কারওয়ান বাজার ও বাংলামোটরসহ রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের সব কটি এআই ক্যামেরাকেই পূর্ণ সচল করা হয়েছে। লাল বাতি অমান্য করা, স্টপ লাইন লঙ্ঘন বা উল্টো পথে গাড়ি চালানোর মতো অপরাধগুলো এই ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করে ডিজিটাল প্রসিকিউশন ও ই-মামলা পাঠানো হচ্ছে।
তাত্ত্বিকভাবে এবং উন্নত বিশ্বের আলোকে বিচার করলে, ট্রাফিক জ্যামজট ও যানজট নিয়ন্ত্রণে এআই ক্যামেরা এক যুগান্তকারী হাতিয়ার। এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহনের রিয়েল-টাইম গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, প্রতি সেকেন্ডে রাস্তার গাড়ির ঘনত্ব পরিমাপ এবং ডিজিটাল ডেটা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়।
ট্রাফিক সিগন্যালে মানুষের কোনো হস্তক্ষেপ ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ির চাপ বুঝে সিগন্যালের সময়সীমা নির্ধারণ করার ক্ষমতা রাখে এই প্রযুক্তি। ফলে যে রাস্তায় গাড়ির চাপ বেশি, সেখানে সবুজ বাতি তুলনামূলক বেশি সময় সচল থাকে এবং স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যালিংয়ের মাধ্যমে জ্যামজটের তীব্রতা অনেকটাই কমে আসে।
তাছাড়া, চালকদের মনে সার্বক্ষণিক নজরদারির একটি মনস্তাত্ত্বিক ভয় তৈরি হওয়ায় আইন অমান্য করার প্রবণতা কমে, যা সড়কের বিশৃঙ্খলা দূর করে পরোক্ষভাবে যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখে।
তবে প্রশ্ন ওঠে—বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত প্রেক্ষাপটে কেবল এআই ক্যামেরানির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কতটুকু যুক্তিসই ও টেকসই?
প্রথমত, ঢাকার ট্রাফিক জ্যামের মূল কারণ শুধু সিগন্যাল অমান্য করা নয়; বরং ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নকশা, যত্রতত্র অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল এবং রিকশা, বাস ও প্রাইভেট কারের মতো ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত মিশ্রণ। যে সড়কে লেন ব্যবস্থাপনাই গড়ে ওঠেনি, সেখানে এআই ক্যামেরার নিখুঁত ‘লেন ভায়োলেশন’ বা ‘স্টপ লাইন ভায়োলেশন’ ট্র্যাকিং অনেক সময়ই বাস্তবসম্মত হয় না।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগের চরম অস্থিতিশীলতা এবং সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীন মাটি খোঁড়াখুঁড়ির কারণে বারবার এই ক্যামেরার তার কেটে যাওয়ার মতো কারিগরি বিপর্যয় ঘটছে, যা প্রযুক্তির ধারাবাহিকতাকে ব্যাহত করছে।
সবচেয়ে বড় সংকটটি হলো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। অতীতেও কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক লাইট বা রিমোট কন্ট্রোল সিগন্যাল ব্যবস্থা বসানো হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণ ও সদিচ্ছার অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে এবং ট্রাফিক পুলিশকে আবারও সেই আদিম ‘হাতের ইশারায়’ ফিরে যেতে হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্যামেরা বন্ধ রাখার যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের মনে পুলিশের প্রতি বিদ্যমান আস্থার সংকটকেই নির্দেশ করে। তাই শুধু ক্যামেরা বসিয়ে ডিজিটালাইজেশনের ফাঁকা বুলি না আউড়ে, আগে সড়ক থেকে অবৈধ পার্কিং দূর করা, লেনের শৃঙ্খলা ফেরানো এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রযুক্তির ব্যবহার তখনই যুক্তিসই হবে, যখন দেশের বাস্তব অবকাঠামো এবং প্রাতিষ্ঠানিক সততা সেই প্রযুক্তিকে ধারণ করার মতো পরিপক্বতা লাভ করবে।

লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট লেখক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।