আবু মেহরাজ শোয়েব : ১৯০ বছর আমরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিলাম।দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছরের শাসনামলে উপনিবেশবাদ কেবল আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, সমাজব্যবস্থা বা মনোজগতে ছাপ রেখে যাইনি এই legacy আমাদের শরীরেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বহন করছি! আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, এই উত্তরাধিকার আমরা আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষে এবং ডিএনএ-তেও বহন করছি। দক্ষিণ এশীয়দের (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান) মধ্যে ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগের উচ্চ ঝুঁকি কেবল বর্তমান জীবনযাত্রার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে শতাব্দী প্রাচীন ঔপনিবেশিক বঞ্চনার করুণ ইতিহাস।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে অন্তত ৩১টি বড় ধরণের দুর্ভিক্ষ সংগঠিত হয়েছিল।এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য : বাংলার মহাদুর্ভিক্ষ (Great Bengal Famine) ছিয়াত্তরের মনন্তর ১৭৭০ সাল( বাংলা ১১৭৭ বঙ্গাব্দ), বিহার দুর্ভিক্ষ (Bihar Famine) ১৮৭৪, দক্ষিণ ভারতের মহাদুর্ভিক্ষ (Great Famine of 1878), ভারতীয় দুর্ভিক্ষ (Indian Famine) ১৮৯৬–১৮৯৭, ভারতীয় দুর্ভিক্ষ (Indian Famine) ১৮৯৯–১৯০০ দেখা দিয়েছিল।এর মধ্যে ১৯৪৩ সালের পঞ্চাশের মনন্তর (বাংলা ১৩৫০ বঙ্গাব্দ) ছিল অন্যতম ভয়াবহ, যেখানে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যায়।নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের মতে, এই দুর্ভিক্ষগুলো খাদ্যের অভাবে নয়, বরং ব্রিটিশদের বৈষম্যমূলক বণ্টন নীতি, অতিরিক্ত কর এবং অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার কারণে ঘটেছিল। এই দীর্ঘকালীন অনাহার আমাদের পূর্বপুরুষদের শরীরে গভীর প্রভাব ফেলেছিল,যেটা আমরা প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বহন করছি।
এক্ষেত্রে বিজ্ঞান কী বলে?
অনাহার-অভিযোজন(Starvation Adaptation): রেডিওলজিস্ট ড. মুবিন সৈয়দ দক্ষিণ এশীয়দের এই শারীরিক অবস্থাকে "Starvation Adapted" (অনাহার-অভিযোজিত) হিসেবে বর্ণনা করেছেন।তার গবেষণায় দেখা গেছে, যখন একটি জনগোষ্ঠী বারবার দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হয়, তখন তাদের শরীর বিবর্তনীয়ভাবে পুষ্টি সঞ্চয় করে রাখার এবং চর্বি না পুড়িয়ে(Burn) তা জমা করার এক কৌশল গ্রহণ করে। University Of Brown এর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এমনকি একটি মাত্র দুর্ভিক্ষ পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ডায়াবেটিস এবং স্থূলতার ঝুঁকি দ্বিগুণ করে দেয় এবং তাদের নাতি-নাতনিদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি ২.৭ গুণ বাড়িয়ে দেয়।শারীরিক উদাহরণ ও বর্তমান ঝুঁকি
এই ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফলে দক্ষিণ এশীয়দের শরীরে কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে।বিপাকীয় বৈশিষ্ট্য: ইউরোপীয়দের তুলনায় দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি ৬ গুণ বেশি।
হৃদরোগের ঝুঁকি: ৫০ বছর বয়সের আগে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে ৪ গুণ বেশি এবং এদের প্রতি তিনজনে একজন ৬৫ বছর বয়সের আগেই হৃদরোগে মারা যান।
শরীরের গঠন: দক্ষিণ এশীয়দের শরীরে পেশির পরিমাণ কম এবং চর্বি (বিশেষ করে পেটের চর্বি) জমানোর প্রবণতা বেশি থাকে। এমনকি একই ধরণের স্বাস্থ্যগত সুবিধা পেতে দক্ষিণ এশীয়দের শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় দ্বিগুণ ব্যায়াম করতে হয়।
বিবর্তনীয় অমিল (Evolutionary Mismatch): বর্তমানে যখন আমাদের এই অনাহার-অভিযোজিত(Starvation Adapted)শরীর আধুনিক বিশ্বের খাদ্যের প্রাচুর্যের সংস্পর্শে আসে, তখন তৈরি হয় এক মারাত্মক বৈষম্য বা 'Evolutionary Mismatch'। আমাদের শরীর এখনো সেই আদিম ক্ষুধার লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত, কিন্তু পরিবেশ এখন উচ্চ-ক্যালরিযুক্ত খাবারে পূর্ণ। ফলে আমরা খুব দ্রুত ডায়াবেটিস এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হচ্ছি।
শিক্ষার্থী
সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশক : মোহাম্মদ বদরুজ্জামান তালুকদার
সম্পাদক : খান মোহাম্মদ সালেক
Copyright © 2026 Daily Dhaka Press. All rights reserved.