নিজস্ব প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কার ২০২৬-এর জন্য বাংলাদেশ থেকে মনোনীত হয়েছেন ১৭ বছর বয়সী মারিয়া আক্তার বেবী। তিনি বর্তমানে সূর্যোদয় শিশু ফোরামের সভাপতি, জাতীয় শিশু ফোরামের কার্যকরী সদস্য এবং প্রায় দুই লাখ শিশুর প্রতিনিধিত্বকারী শিশু নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি তিনি YouthNet Global-এর Children & Adolescents Wing-এর Coordinator হিসেবে কাজ করছেন।
ছোটবেলা থেকেই মানুষের জন্য কিছু করার আগ্রহ ছিল মারিয়ার। একটি ড্রয়িং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি প্রথম শিশু ফোরামের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন। তখন শিশুদের অধিকার বা নিজেদের কথা বলার অধিকার সম্পর্কে তেমন কিছু জানতেন না। অন্য শিশুদের বিভিন্ন সমস্যা ও অধিকার নিয়ে কথা বলতে দেখে তিনি প্রথম জানতে পারেন যে শিশুদেরও নিজেদের মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে।
মাত্র ১৩ সদস্যের একটি ওয়ার্ড পর্যায়ের শিশু কমিটি দিয়ে তাঁর কাজের শুরু। ধীরে ধীরে উপজেলা, জেলা, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিশুদের হয়ে কথা বলার সুযোগ পান তিনি। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কার্যক্রম তাঁর আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ :বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে স্থানীয় পর্যায়ে শিশুদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে কাজ করেন মারিয়া। তাঁর উদ্যোগে তাঁর কাজের এলাকায় শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নারী ও শিশু সহায়তা ব্যবস্থাকে সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
স্থানীয় পুলিশ, কাউন্সিলর, গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেন তিনি। সচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্ক থেকে কোনো এলাকায় বাল্যবিবাহের খবর পাওয়া গেলে তারা দ্রুত সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসন ও আইনি সহায়তার মাধ্যমে বাল্যবিবাহ বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এভাবে এখন পর্যন্ত ২৯টি বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে তিনি কাজ করেছেন।
শিশুশ্রম থেকে শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা : শিশুশ্রম নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে মারিয়া মনে করেন, শুধু শিশুকে কাজ থেকে সরিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হয় না; শিশুটির পরিবারের আর্থিক সমস্যার সমাধানেও সহযোগিতা করা প্রয়োজন।এজন্য বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিশুদের বাবা-মায়ের জন্য জীবিকা ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন। পাশাপাশি স্কুলের প্রধান শিক্ষক, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর উদ্যোগে ৪৬ জন শিশুকে শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করে স্কুলে ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করা হয়েছে।
এছাড়া পড়াশোনা চালিয়ে যেতে আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন এমন শিশুদের জন্য সহায়তাও সংগ্রহ করেছেন তিনি। তাঁর কার্যক্রম দেখে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী একজন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং শিশুদের জন্য কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে তাঁর সহযোগিতায় ১০ জন ঝরে পড়া শিশুর সারা বছরের পড়াশোনার খরচের ব্যবস্থা করা হয়।
শিশু অধিকার ও জলবায়ু ন্যায়বিচার : জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিশু অধিকার নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তুলে ধরেন মারিয়া। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন শিশুদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
মাঠপর্যায়ে শিশুদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন দুর্যোগের কারণে অনেক পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে চলে আসে। এরপর অর্থনৈতিক সংকটের কারণে কোনো শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত হয়, আবার কোনো মেয়ের বাল্যবিবাহের ঝুঁকি তৈরি হয়।
তাই শিশুদের অধিকার নিয়ে কথা বলার সময় জলবায়ু ন্যায়বিচারের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে শিশুদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দাবিগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে এক লাখেরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানোর কথা জানান তিনি।
“বড় নেতা নয়, ভালো নেতা হতে চাই”

