রোটারিয়ান নাজমুল হাসান: সম্প্রতি ঢাকা জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, “পোশাক শিল্পের চাকা সচল থাকলে গতিশীল থাকবে দেশের অর্থনীতি। কোনোভাবেই যেন এই শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।”
একজন জেলা প্রশাসক হিসেবে তার এই উপলব্ধি শুধু প্রশংসনীয়ই নয়, বরং এই মুহূর্তে জাতির জন্য একটি সতর্কবার্তা।
আমরা সবাই জানি, বাংলাদেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে পোশাক শিল্পের ওপর। আমাদের মোট রপ্তানি আয়ের ৮৪ ভাগ আসে এই খাত থেকে। প্রায় ৪০ লক্ষ শ্রমিক, যার ৬০ ভাগ নারী, তাদের জীবন-জীবিকা এই শিল্পের সাথে জড়িত। এর সাথে পরোক্ষভাবে জড়িত আরও ১ কোটি মানুষ। বোতাম, সুতা, জিপার, কার্টন, পরিবহন, ব্যাংকিং – একটি বিশাল সাপ্লাই চেইন ঘুরছে এই চাকাকে কেন্দ্র করে। তাই এই চাকা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু একটি কারখানা বন্ধ হবে না, বন্ধ হয়ে যাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ নানা কারণে এই চাকার গতি কমিয়ে দেবার চেষ্টা চলছে।
কেন এই শিল্প আজ হুমকির মুখে?
১. অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা: কিছু স্বার্থান্বেষী মহল শ্রমিক অসন্তোষের নামে কারখানা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করছে। একজন প্রকৃত শ্রমিক কখনো তার নিজের রুটি-রুজির জায়গায় আগুন দিতে পারে না। এর পেছনে আছে গভীর ষড়যন্ত্র।
২. আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র: বাংলাদেশ যখন বিশ্ব বাজারে দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক, তখন প্রতিযোগী দেশগুলো চায় না আমরা এগিয়ে যাই। তাই “অস্থিতিশীল” তকমা দিয়ে বিদেশি বায়ারদের ভয় দেখিয়ে অর্ডার ভিয়েতনাম বা কম্বোডিয়ায় সরিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত চলছে।
৩. নীতির অভাব: গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, বন্দরে হয়রানি – এই সবকিছু মিলিয়ে আমাদের উৎপাদন খরচ প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে ১০-১৫% বেশি হয়ে যাচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মহোদয় যথার্থই বলেছেন, এটি নিশ্চিত করা “আমাদের সবার দায়িত্ব”। এই দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়।
আমাদের করণীয় কী?
মালিকদের দায়িত্ব: শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। শ্রমিক খুশি থাকলে কারখানায় কেউ আগুন দিতে পারবে না।
শ্রমিকদের দায়িত্ব: মনে রাখতে হবে, কারখানা বাঁচলে চাকরি বাঁচবে। কোনো উসকানিতে নিজের পায়ে কুড়াল মারা যাবে না। দাবি আদায়ের জন্য আলোচনাই শ্রেষ্ঠ পথ, ভাঙচুর নয়।
সরকার ও প্রশাসনের দায়িত্ব:
জেলা প্রশাসক ফরিদা খানমের মতোই প্রতিটি প্রশাসনকে কঠোর হতে হবে। যারা পরিকল্পিতভাবে শিল্প ধ্বংস করতে চায়, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ ও ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
আমাদের সাধারণ নাগরিকের দায়িত্ব: এই শিল্প নিয়ে কোনো গুজব বা অপপ্রচারে কান না দেওয়া।
পোশাক শিল্প শুধু একটি শিল্প নয়, এটি আমাদের স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় অর্জন। ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা এনেছি, আর পোশাক শিল্প দিয়ে আমরা অর্থনৈতিক মুক্তি এনেছি। এই মুক্তিকে কোনোভাবেই হাতছাড়া হতে দেওয়া যায় না।
আসুন, জেলা প্রশাসকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরা সবাই শপথ করি – পোশাক শিল্পের চাকা আমরা সচল রাখবই। কারণ এই চাকা সচল থাকলেই সচল থাকবে আমার আপনার বাংলাদেশ।
লেখক :বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিক এবং রাষ্ট্রচিন্তক।

